নিঃশব্দ প্রতিশোধ

বিজ্ঞাপন: ০১

Type Here to Get Search Results !

বিজ্ঞপ্তি: ০১

বিজ্ঞাপন: ০২

নিঃশব্দ প্রতিশোধ


ঠাকুরগাঁও জেলার ছোট্ট একটি শহর রানীশংকৈল। শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি সরু নদী, তার পাশে কলেজ। সেই কলেজেই পড়ে রিমি আর সায়মা। দুজনেই দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। রিমি একটু হাসিখুশি, মুখে সারাক্ষণ দুষ্টু দুষ্টু হাসি লেগে থাকে। সায়মা গম্ভীর, চোখে চশমা, সবসময় বই-খাতায় মুখ গুঁজে থাকে। ওদের বন্ধুত্ব এমন যে কলেজে কেউ আলাদা ভাবে না। টিফিন ভাগ করে খাওয়া, পরীক্ষার আগে রাত জেগে একে অপরকে প্রশ্ন পড়ানো, খারাপ লাগলে চোখের পানি মুছে দেওয়া সবই ছিলো ওদের বন্ধুত্বের গল্পে।


সায়মা মাঝেমাঝে বলত, ‘রিমি, তোর তো মাথায় দুষ্টুমি ছাড়া কিছু নাই। ভালো করে পড়াশোনা কর, না হলে কী হবে জানিসই তো।’ রিমি হেসে বলত, ‘আমি তোকে দেখে দেখেই পড়ে ফেলি, তোর ব্রিলিয়ান্স আমায় ছুঁয়ে যায়!’ সায়মা মুখ গম্ভীর করে রাখলেও তার চোখের কোণে মায়া দেখা যেত। এই বন্ধুত্বের ঋতুতে যেন কোথাও কোনো আঁচ ছিল না। অথচ অদূরে এক ঝড় ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল যার খবর কেউ জানতো না। শীতের সকালের সূর্যটা ছিল সোনালি। কলেজ প্রাঙ্গণে জমে থাকা কুয়াশা যেন ধীরে ধীরে সরে গিয়ে একটি নতুন দিনের কাহিনি লিখছিল। সেই দিনটিই ছিল রিমির জীবনে মোড় ঘোরানো দিন। প্রতিদিনের মতোই সে ও সায়মা কলেজে ঢুকল, বেঞ্চে বসলো, বই খুললো কিন্তু হঠাৎ এক দৃষ্টি এসে থমকে দিল রিমিকে।


সে ছিল অরবিন্দ! বাইকে বসা ছেলেটা। মুখে হালকা দাড়ি, চোখে বক্র হাসি, হাতে একটা কাগজের ঠোঙায় ভাজা চানাচুর।সে রিমির দিকে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইছিল। এক-দু’দিন নয়, এটা ঘটছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। প্রতিদিন কলেজ ছুটির পর বাইক নিয়ে এসে দাঁড়াতো সে, একটানা তাকিয়ে থাকতো রিমির দিকে। সায়মা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল একদিন। রিমিকে বলেওছিলো, ‘ওই ছেলে কী তোর পেছনে পড়ে গেছে?’ রিমি একটু লজ্জা পেলেও বললো, ‘ধুর! না, না, এমনি তাকায় হয়তো। আমি পাত্তা দিই না।’ কিন্তু সেটা ছিল আধা সত্য। রিমির মনের কোণে সেই দৃষ্টির জাল ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। একদিন কলেজ গেট দিয়ে বের হতেই অরবিন্দ এগিয়ে এসে বললো, ‘একটু কথা বলতে পারি?’ রিমি কুণ্ঠিত হয়ে মাথা নেড়ে চলে গেল। তবে তার পায়ের তলায় যেন কাঁপুনি। 

আরও পড়ুন: পরকীয়া

পরের দিন কলেজ ব্যাগের মাঝে একটা ভাঁজ করা চিরকুট পেল রিমি। তাতে লেখা, ‘তোমার চোখে আমার ভবিষ্যৎ দেখি। দয়া করে একবার কথা বলো। আমি অপেক্ষায় থাকবো।’ রিমি প্রথমে হাসলো, ভাবলো এসব সিনেমার সংলাপ। কিন্তু একধরনের আগ্রহ জন্ম নিল। সেই আগ্রহই ছিল বিষের প্রথম ফোঁটা। পরের দিন, তারও পরের দিন, প্রতিদিন অরবিন্দ দাঁড়িয়ে থাকত। কোনো এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বের হয়ে সে বলল, ‘আমি জানি তুমি মুসলিম, আমি হিন্দু। কিন্তু ভালোবাসা কি জাত দেখে আসে?’ এই কথাটি যেন রিমির ভিতর কোথাও ঢুকে গেল। সে কখনো কোনো ছেলের কাছ থেকে এমন সাহসিক প্রেমের কথা শোনেনি। ধীরে, ধীরে তারা কথা বলা শুরু করল। প্রথমে ফোনে পরে সামনাসামনি। রিমি কিছুই বললো না সায়মাকে। কেন বললো না সেটা সে নিজেও জানে না। হয়তো ভয় বা নিজের একান্ত অনুভব।

আরও পড়ুন: ‍মুমিনের পতন

অরবিন্দ খুব সাবলীলভাবে কথা বলতো। সে বই পড়ত, কবিতা লিখত, মাঝে মাঝে রিমির জন্য ছোট উপহার আনত। একবার কাঁচের ব্রেসলেট উপহার দিয়ে বলেছিল, ‘এই কাঁচ যেমন স্বচ্ছ, তেমনি তুমি। আর যদি ভেঙ্গে যায় যেমন কষ্ট হবে তেমনি তোমাকেও হারালে আমার জীবন ভেঙে যাবে।’ রিমি মুগ্ধ হয়ে শুনত। তাদের প্রেম কলেজ পেরিয়ে শহরের পার্ক, নদীর ঘাট, লুকোনো অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়লো। মাঝে মাঝে একসাথে হোস্টেলের ছাদেও দেখা করত। কিন্তু সব প্রেমই তো শুধু গোলাপ দিয়ে গাঁথা হয় না। কোথাও না কোথাও থাকে কাঁটা। রিমির সেই কাঁটা এসে লাগলো ঠিক তখন, যখন অরবিন্দের প্রেমে না বুঝেই সে আগুনে ঝাপ দিল।

আরও পড়ুন: ‍শেষ বিদায়ের কালে

সেই রাতে সে নিজেকে অরবিন্দের হাতে সঁপে দেয়। তখনও জানতো না এই ভালোবাসা নয়, ছিল এক পরিকল্পিত ফাঁদ। প্রেমের প্রথম ছোঁয়ার পর সময় যেন পাল্টে গেল রিমি এখন আর আগের মতো হাসিখুশি নেই। অরবিন্দের প্রতি ভালোবাসা এক অদ্ভুত ভয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন অরবিন্দকে না দেখলে অস্থির লাগে অথচ দেখা হলে বুক ধকধক করে। একদিন সায়মা খেয়াল করলো রিমি ক্লাসে খুব চুপচাপ। হোস্টেল রুমে ফিরেও সে দরজা বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ আয়নার সামনে বসে থাকে। সায়মা ভাবলো, হয়তো কোনো পারিবারিক ঝামেলা। কিন্তু ইদানিং রিমির সাথে কেমন যেন দূরত্ব তৈরি হচ্ছে যেটা অদ্ভুত রকমের অচেনা। রিমি হঠাৎ একদিন সকালবেলা ক্লাসে এসে কাঁপতে কাঁপতে বাথরুমে দৌড় দিল। বারবার বমি করছিল। সায়মা ছুটে গিয়ে তাকে ধরে বলল, ‘রিমি! তুই ঠিক আছিস? তোর গা গরম, কিছু খেয়েছিস?’ 


রিমি মাথা নাড়ল, কিছু বলল না। তা। তার চোখ যেন কুয়াশায় ভরা। কয়েকদিন পর, কলেজ শেষে এক প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে রিমি টেস্ট করাল। রিপোর্ট হাতে পেয়ে তার পা অবশ হয়ে গেল। সে সন্তান সম্ভাবা! ঘরের ভেতর ড্রয়ার খুলে সেই পুরনো চিরকুটটা বের করল, ‘তোমার চোখে আমার ভবিষ্যৎ দেখি।’ রিমি কাগজটা ছিঁড়তে চাইল কিন্তু পারল না। অরবিন্দকে ফোন দিল। অনেকবার একটার পর একটা কিন্তু সে ধরলো না। তখন রিমি বুঝল কিছু একটা ভুল হচ্ছে। খারাপ কিছু। সেই রাতে অরবিন্দ নিজেই ফোন দিল। কণ্ঠে বিরক্তি। ‘তুমি এত ফোন দিচ্ছ কেন?’ রিমি কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘আমি.... আমি মা হতে চলেছি। আমার কী হবে অরবিন্দ?’


ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর হেসে উঠল অরবিন্দ। ‘ভালোই নাটক পারো তুমি।’ ‘নাটক নয়! প্লিজ, তুমি তো বলেছিলে আমরা এক হবো!’ ‘আমরা? না রিমি। আমি আমাদের এক হওয়ার কথা কখনো বলিনি। বুঝতে পারো না? আমি ভারতের ঐ সংঘের লোক, যাদের দায়িত্ব হচ্ছে মুসলিম মেয়েদের ভুলিয়ে ফাঁদে ফেলে জীবনের বারোটা বাজানো। তুমি ছিলে আমাদের টার্গেট। আমি সফল। এবার আমার মিশন শেষ। বাই!’ ফোনটা কেটে গেল। রিমি অন্ধকারে বসে কান্না করল পুরো রাত। পরদিন সাহস করে অরবিন্দের বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে হাজির হল। দরজা খোলা পেল। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

‘তুমি যা বললে সবটা যদি সত্যিই হয় তবে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু আমার সন্তানের কী হবে?’ অরবিন্দ তখন ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘সন্তান? আমার কিছু যায় আসে না। আর আজ তুমি এসেছো তো ভালো করেছো। আমি নিজেই সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছি।’ তৎক্ষনাৎ অরবিন্দ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রিমিকে। মাথায় আঘাত পেলো। এরপর কিছুক্ষণ কেবল রক্ত, ধোঁয়া আর নিস্তব্ধতা। রিমির দেহ নিথর হয়ে গেল। কিন্তু তার হাতে ধরা ছিল এক চিঠি ও একটি ছবি। সায়মার নামে লেখা চিঠি। সায়মা, আমি জানি, তুই ভাবছিস কেন তোকে কিছু বলিনি! লজ্জা, ভয় আর প্রেম এই তিনটায় আমি হেরে গেছি। কিন্তু তুই জিতবি। আমার মৃত্যুর জন্য এই ছেলেটা দায়ী। তার ছবি রাখলাম, মনে রাখিস ওর মুখ। যদি কখনো তোর সামনে পড়ে আমার জন্য ন্যায়বিচার এনে দিস।

আরও পড়ুন: দেয়ালের ওপাশে

তোকে অনেক ভালোবাসি। খুব, খুব মিস করবো ওপারে। রিমি সায়মার চিঠিটা পড়ার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। সে জানত প্রতিশোধ নিতেই হবে এবং মনঃস্থির করে ফেললো। রিমির মৃত্যু যেন কলেজ জুড়ে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল। সবাই বলছিল, ‘আত্মহত্যা’ কেউ বলছিল, ‘দুর্ঘটনা’ আবার কেউ বলছিল, ‘মানসিক সমস্যা’। কিন্তু একমাত্র সায়মা জানত এই মৃত্যু ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যা। চিঠিটা সে বুকের খুব কাছে রেখে দিয়েছিল। ছবি দেখে অরবিন্দের মুখ মনে গেঁথে ফেলেছিল। কিন্তু মুখে কিছু বলেনি কাউকে। পুলিশও মামলাটি গড়িমসিতে ধামাচাপা দিলো কারণ অপরাধী ছিল একজন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। রিমির হোস্টেলের ঘরটা খালি হয়ে গেল। আলমারিতে পড়ে ছিল কয়েকটা বই একটা ছেঁড়া চিরকুট আর একটা টেডি বিয়ার যেটা অরবিন্দ তাকে দিয়েছিল। সায়মা সেগুলো এক এক করে নিজের ব্যাগে ভরে ফেলল। সেই মুহূর্তে তার চোখে জল ছিল না শুধু একটা ভয়ঙ্কর অঙ্গীকার তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

‘আমি তোকে কথা দিচ্ছি, রিমি। তোর গর্ভে যে জীবন জন্ম নিয়েছিল তাকে খুন করার দাম আমি শোধ করবো।’ সায়মা বদলে গেল। আর সে আগের মতো ক্লাসে গম্ভীর, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা মেয়েটি নয়। এখন সে সাজে, হাসে, মিষ্টি কথা বলে। একটি পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি তৈরি করে যা অরবিন্দকে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। সে জানতো অরবিন্দ এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।সে দেশের বাইরে অবস্থান করছে এমন কথা রটেছে। কিন্তু সায়মা মনে মনে জানত, একদিন সে আবার ফিরবে।কারণ, শিকারি যত দূরই যাক নিজের গন্ধের কাছে আবার ফিরে আসে। এভাবে একটা বছর কেটে গেল। সায়মা একা একা রিমির কবরের পাশে বসে কথা বলতো, ‘তুই বলেছিলি না বিচার যেন পাই। আমি দিবো। আমি আজও তোর ছবি কাছে রেখে ঘুমাই রিমি। কিন্তু আর চোখে জল আসে না।শুধু আগুন জ্বলে।’

সেই বছর সায়মা স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হল নাটক ও কবিতা আবৃত্তিতে দক্ষতা দেখাতে লাগলো। মানুষ তার বদলে যাওয়া দেখে অবাক কেউ জানত না এর পেছনের কারণ। একদিন কলেজ ক্যাম্পাসে খবর ছড়ালো এক যুবক বাইকে করে এসেছে চেনা না অচেনা বোঝা যায় না। সায়মা বুঝে নিয়েছিলো এই অরবিন্দ আর এটাই তার সময়। সেই ছায়াময় মুখ, ঠোঁটে পুরনো বাঁকা হাসি অরবিন্দ ফিরেছে, খুনি ফিরেছে। মনে মনে আওড়াতে লাগলো। কেউ বললো সে এখন “নতুন ব্যবসা’ করছে, কেউ বললো ‘একটা এনজিও চালায়’। কিন্তু সায়মা জানত, ওসব মুখোশ মাত্র। সায়মা নিজের পরিকল্পনা শুরু করলো। নিজেকে অরবিন্দের নজরে আনার জন্য প্রতিদিন হোস্টেল থেকে বের হয়ে শহরের কেফেতে যেত, বই পড়তো, মৃদু হাসি হাসতো। ঠিক যেমনটা রিমি একসময় করতো।

একদিন কেফেতে বসে থাকা অবস্থায় এক কাপ কফি তার দিকে এগিয়ে দিল এক যুবক, ‘মাফ করবেন! এই কফিটা আমি আপনার জন্য আনিনি। কিন্তু যদি নেন, খুব খুশি হবো।
‘নাম?’ রাহুল। সে মুখে অন্য নাম বললেও সায়মা জানত এই ছেলেটা অরবিন্দ। ভেতরে। ভেতরে যতই আগুন জ্বলুক সে ঠোঁটে একটুকরো নরম হাসি ছড়িয়ে দিল। "তাহলে কফিটা একসাথেই হোক।’ কফির কাপে শুরু হয়েছিল যে বন্ধুত্ব সেটা দিনে দিনে রঙ নিতে লাগল প্রেমের। অরবিন্দ যদিও এখন সে নিজেকে ‘রাহুল’ বলে পরিচয় দেয়। প্রথম থেকেই রাহুল ধারণা করেছিলো এই মেয়েটি হয়তো আলাদা। তবে সে কখনো ভাবতে পারেনি এই মেয়েটির পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কারণ তার আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট সে ছিল ‘ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার" এক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়।

সায়মা প্রতিদিন অরবিন্দের কাছে একটু একটু করে কাছে যেতে লাগল। কখনো বইয়ের আড্ডা কখনো হেঁটে বেড়ানো কখনো গান সবকিছুতেই সে এমনভাবে নিজেকে জড়িয়ে তুলল যেন সে সত্যিই প্রেমে পড়েছে। একদিন সায়মা বলল ‘তুমি কী সত্যিই ভালোবাসো আমাকে? অরবিন্দ ঠোঁটে এক ভেজা হাসি এনে বলল, ‘ভালোবাসা শব্দটা আমি আগে বুঝিনি কখনো কিন্তু তোমাকে দেখে শিখেছি, শিখছি।’ সায়মার মুখে হাসি কিন্তু বুকের গভীরে রিমির রক্তাক্ত মুখ ভেসে ওঠে। সে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে, ‘ভালোবাসা তো বড় অদ্ভুত, না? একদিন সায়মা নিজে থেকে অরবিন্দকে তার হোস্টেলে ডাকে। ‘আমার রুমমেট নেই আজ একটু একা একা লাগছে। অরবিন্দ বুঝে যায়, সে এখন পুরোপুরি জালে।হোস্টেলের ছাদে দাঁড়িয়ে সায়মা বলল, ‘তুমি জানো, প্রেম একটা দায়। কেউ একজন যদি নিজেকে পুরোটা দেয় সেই দায় কিন্তু তার হয়ে যায় না?

অরবিন্দ একটু অবাক হলেও পাত্তা দেয়নি। ছাদ থেকে রাতের শহর দেখে সে বলল, ‘তুমি ভয় পাচ্ছ? সায়মা মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘না, ভয় নয়। অপেক্ষা!’ ‘কিসের অপেক্ষা?’ সায়মা এবার তার চোখে চোখ রাখল। ‘প্রতিশোধের।’ রাত ১১টা। হোস্টেলের পেছনের পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে যেখানে কেউ আসে না, সায়মা অরবিন্দকে নিয়ে গেল। সেখানেই হঠাৎ সে অরবিন্দকে চেপে ধরল। ঠিক সেই সময় সায়মা তার ব্যাগ থেকে একটি ধারালো ছুরি বের করল। অরবিন্দ বুঝে ওঠার আগেই সায়মা ফিসফিস করে বলল, ‘এই জায়গাটাই রিমি শেষবার নিঃশ্বাস নিয়েছিলো। আর এখন তুমি শেষ নিঃশ্বাস নেবে।’ ছুরির প্রথম আঘাত অরবিন্দের বুক বরাবর। সে ছটফট করছিল, সায়মা তখন কাঁদছিল না সে শুধু বলছিল এইটা রিমির জন্য, এইটা তার সন্তানের জন্য আর এইটা আমার জন্য!’ তিনটি ছুরির আঘাত, তিনটি রক্তবিন্দু স্রোতধারা আর একটি দেহ নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে রইলো। সায়মা হাঁপাচ্ছিল। শরীর কাঁপছে। কিন্তু মনে শান্তি। সে পকেট থেকে সেই পুরনো চিঠিটা বের করে অরবিন্দের রক্তের পাশে রাখল।

রাত তিনটা। শহরের ঘুমিয়ে পড়া রাস্তার মাঝে একলা দাঁড়িয়ে সায়মা। হাতে মোবাইল, ভাঙা গলায় সে ফোন করল ‘হ্যালো, পুলিশ? আমি সায়মা হোসেন। আমি একজন খুনি। ঠিকানা লিখে নিন, কলেজ হোস্টেলের পিছনে পরিত্যক্ত ঘর।’ পাঁচ মিনিটের মাথায় সাইরেনের শব্দ ছুটে আসে। পুলিশের চোখে বিস্ময়! মেয়েটি একা, মুখে ভয় নেই, চোখে শুধু ক্লান্তি। প্রথম প্রশ্নঃ কেন খুন করলে? থানার নির্জন ঘরটা থেকে একজন অফিসার জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি কি মানসিকভাবে অসুস্থ? তুমি জানো, তুমি যেটা করেছো সেটা ফাঁসির যোগ্য অপরাধ?’ সায়মা মাথা নিচু করে রইল। বলল না কিছুই।কিছুক্ষণ পর ধীরে বলতে শুরু করলো, "আমি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলাম, রিমির অপরাধ কী ছিল? সে কী করেছিলো যে তার গর্ভে সন্তান আসার পর তাকে মেরে ফেলা হলো? সেই উত্তর আমি আর রাষ্ট্র পেলাম না। তাই আমি নিজেই বিচার করেছি।

মামলা গড়ায় আদালতে! এবং দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিরোনামগুলো হয়ে ওঠে ‘প্রেমিককে খুন করল প্রেমিকা! প্রতিশোধের খুন! কিন্তু আসল সত্য কি সেটা খুব কম লোক জানে। অভিযোগপত্রে লেখা হলো ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ নিজ স্বীকারোক্তি, ইচ্ছাকৃত শারীরিক প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে প্রতিশোধ।’ মামলার শুনানিতে সায়মা তার চিঠিটা পেশ করল। রিমির লেখা শেষ চিঠি, অরবিন্দের ছবি এবং নিজের স্মৃতিচারণ। জজ এক পর্যায়ে বললেন, ‘তুমি বুঝতে পারছো, তুমি রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করেছো। আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’ সায়মা শান্তভাবে উত্তর দিল, ‘আইন যখন অন্ধ থাকে, তখন ন্যায়বিচার মানুষকে খুঁজে নিতে হয়, স্যার।’ মাস ছয়েক চলল মামলার শুনানি। নানা বিতর্ক, সমাজের দ্বিধা, আন্দোলন, কিছু সমর্থন, কিছু ঘৃণা।

শেষ পর্যন্ত আদালত রায় দিল ‘আসামি সায়মা হোসেনকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। তার কাজ ছিল একটি হত্যাকাণ্ড যদিও উদ্দেশ্য ছিল বিচার। যা রাষ্ট্রের চোখে এটি অপরাধ।’ জেলখানায় একটি নির্জন কক্ষ। নাম ‘সেল নম্বর ১১’। সায়মা এখন সেখানেই থাকে। প্রতিদিন সকালে রিমির ছবি নিয়ে বসে থাকে। তার ঠোঁটে কোনো কান্না নেই। শুধু বলে ‘রিমি, তোকে দেওয়া কথা আমি রেখেছি। তুই শান্তিতে ঘুমা এখন।’ দিনপঞ্জির পাতায় আজ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে সায়মার কারাবরণের। জেলখানার লোহার দরজার ওপারে বসে আছে একদল সাংবাদিক, সমাজকর্মী, নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী আর তরুণ প্রজন্মের কিছু শিক্ষার্থী।

তারা সায়মাকে দেখে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে কিন্তু সায়মা কোন প্রশ্নের তোয়াক্কা করেনা, কোন উত্তর দেয়না শুধু বসে থাকে আর কি যেন ভাবে। সায়মার সেল এখন আর নিঃসঙ্গ নয়। সেখানে আছে কিছু বই, কাগজ, কলম। জেলখানার অন্যান্য কয়েদিনীরা তাকে ‘আপু’ বলে ডাকে। তাদের অনেকেই নিজেদের জীবনের গল্প বলে তাকে, আর সায়মা তাদের শেখায় ভয়’ নয়, প্রতিবাদ করতে শেখো। চোখে চোখ রেখে দাঁড়াতে শেখো।’ প্রতিদিন সন্ধ্যায় সায়মা একটা একটা করে চিরকুট লেখে, কেউ পড়ে না, কেউ পায় না, কিন্তু সে জানে রিমি শুনছে। পাঁচ বছরের সব চিরকুটগুলো নিয়ে একটি বই প্রকাশ হয় আর বইটি প্রকাশের পর সমাজে তৈরি হয় এক তীব্র আলোড়ন। নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত তরুণেরা এই বইকে ‘বেদনার প্রতীক’ বলেও অভিহিত করে।

কেউ কেউ দাবি তোলে সায়মার সাজা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী রুবিনা আফরোজ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সায়মার নিজ হাতে বিচার একটি সমাজের চরম ব্যর্থতার দলিল। তাকে শাস্তি নয় মুক্তি দেওয়া হোক।’ অবশেষে, ৬ষ্ঠ বর্ষে সরকার সাধারণ ক্ষমার আওতায় সায়মাকে মুক্তি দেয়। জেল থেকে বেরিয়ে সে রিমির কবরের পাশে গিয়ে বসে। হাতে একটি ফুল, গায়ে হালকা নীল শাড়ি। সে চুপচাপ বলে, ‘রিমি, আমি মুক্ত। কিন্তু তোকে হারিয়ে আমার ভিতরটা বন্দি থেকেই গেছে। তুই ছিলি বলেই আমি সাহস পেয়েছিলাম। তোকে ভালোবাসি রে।’ এরপর সায়মা প্রতিদিন নিদারুণ চিরকুট লেখতেন। যার অধিকাংশ ছিলো বেস্ট ফ্রেন্ড রিমির জন্য।

আরও পড়তে: পরিণাম

হঠাৎ একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় সায়মার মৃত্যু হয়। এনিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক ছড়িয়ে পরে গ্রাম, মহল্লা, শহর এমনকি পুরো দেশে। অনেকের মুখে মুখে শোনা গেলো ‘বেস্ট ফ্রেন্ডের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তিনি নিজেই খুন হলেন, এবার তার মৃত্যুর প্রতিশোধ কে নিবে?’ তদন্ত সাপেক্ষে সায়মার বাসা থেকে অনেক প্রমানের সাথে একটি টিনের বাক্সও পাওয়া গেলো। যেখানে অনেক চিরকুট তার বেশিরভাগ রিমির জন্য লেখা। তার মধ্য থেকে রিমির জন্য সায়মার লেখা শেষ চিরকুটটি এমন ছিলো রিমি, তুই ছিলি আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ। তোর চোখের জল আমার সাহস হয়ে উঠেছিল। আজ আমি কারো প্রেমে পড়তে ভয় পাই না কারণ আমি জানি, ভালোবাসা যেমন জীবন দেয় তেমন সর্বনাশও করে।

কেনাকাটা করতে: অবেলার শপ

আমার নীরব প্রতিশোধের গল্প হয়তো সমাজকে জাগাবে না কিন্তু হয়তো কোনো এক দিন, কোনো এক সময় কোন এক মেয়ে এই চিঠি পড়ে সাহস পাবে। সেই দিন আমি সত্যিই মুক্ত হবো। ইতি, তোর সায়মা।

লেখকঃ রাইয়্যান ইসলাম রকিব।
ঠিকানা: ঠাকুরগাঁও বাংলাদেশ।

আমার আসল বন্ধু আয়না, কারণ যখন আমি কাঁদি এটা কখনও হাসে না। [চার্লি চ্যাপলিন]

বিজ্ঞাপন: ০৩ [Top]

বিজ্ঞাপন: ০৪ [Below]

বিজ্ঞাপন: ০৫

বিজ্ঞাপন: ০৬