Hot Widget

Type Here to Get Search Results !

Headline

Notice: To read this website in your country's language, please change the language. Contact us for advertising: +8801516332727 (What's App) Thank you.

মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজার বাংলায় আগমন এবং মীরবহর এর ভূমিকা


ছবিটি অজ্ঞাত শিল্পীর আঁকা মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজার। ছবিটি কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থিত মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্টে সংরক্ষিত আছে। এই চিত্রকর্ম ছবিটি অনলাইন ভিত্তিক শিল্পসাহিত্যের প্লাটফর্ম ইস্ট ইস্ট থেকে নেওয়া।

মোঃ রিসালাত মীরবহর।। মীর বা মির (মীর مير) একটি রাজকীয় পদবি বা রাজদত্ত পদবি যা পাক-ভারত উপমহাদেশের অনেক অঞ্চলে বা রাজ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এছাড়া ইসলামিক প্রভাবের বিভিন্ন দেশ বা রাজ্যে এই পদবি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। হায়দারাবাদের নিজামদের পদবি ছিল ‘মীর’। ‘মীর’ শব্দটিকে ফার্সি শব্দ ‘পীর’ এর আরবি পরিভাষা হিসেবে অনুমান করা হয়ে থাকে। অনেকেই ‘মীর’ শব্দটি আরবি ‘আমির’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করেন। মুঘল সাম্রাজ্যে বিভিন্ন সামরিক শাখার প্রধানদেরকে ‘মীর’ পদবি দেওয়া হতো।

🔹 মীর বহর অর্থ:
‘মীর বহর’ ছিল মুঘল শাসনামলে ব্যবহৃত এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পদ।
মীর (فارسী/আরবি): প্রধান বা অধিনায়ক।
বহর: নৌবাহিনী বা নওয়ারা (ফ্লোটিলা)।
অর্থাৎ, ‘মীর বহর’ হচ্ছেন ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘জাহাজবহরের অধিনায়ক’।
সুতরাং ‘মীর বহর’ মানে হলো ‘নৌবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তা’ বা ‘জাহাজবহরের অধিনায়ক’ কে বোঝানো হয়েছে।

🔹 মীর বহর এর প্রধান দায়িত্বসমূহ:
◉ দুর্গ, বন্দর ও উপকূল রক্ষা।
◉ সমুদ্র ও নদীপথে দস্যু দমন।
◉ নৌবাহিনী পরিচালনা ও শাসন।
◉ যুদ্ধের সময় সম্রাট বা সুবেদারের নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া।
◉ অভ্যন্তরীণ নদীপথ ও সমুদ্রপথে নৌবহর সংরক্ষণ ও পরিচালনা।
◉ নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শুল্ক আদায়।
◉ রাজপরিবারের নিরাপত্তা ও পালানোর সময় নৌপথ নিশ্চিত করা।
◉ প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে গভর্নরের অধীন কাজ করা।
◉নদীর ওপর নৌকা ব্যবহার করে ব্রিজ বা পুল নির্মাণে সহায়তা করা এবং বাণিজ্যিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।

🔹 মীর বহর উপাধি:
সময়ের সাথে সাথে মুঘল আমলের এ সামরিক/প্রশাসনিক উপাধি একটি বংশগত পদবীতে রূপ নেয়। যারা সেই সময় উচ্চপদস্থ নৌসেনা বা নদীপথের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের বংশধরেরা পরবর্তীতে ‘মীর বহর’ পদবী ধারণ করতে থাকেন।

🔹 বাংলার প্রেক্ষাপটে মীর বহর:
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এখানে নৌবাহিনী ছিল খুবই শক্তিশালী। তাই মুঘল আমল থেকে ‘মীর বহর’ পদটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নদীপথ রক্ষা, বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে রাখা, সৈন্য ও রাজপরিবার পরিবহন সহ সবকিছুর দায়িত্ব ছিল ‘মীর বহর’ এর উপর ন্যাস্ত।

🔹 মীর বহর পদটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
◉ মুঘল আমল ও নবাবি আমলে ‘মীর বহর’ পদটির সূচনা হয়।
◉ বাংলায় বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদী পথের জন্য ‘মীর বহর’ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
◉ মীর বহর ছিলেন নদী ও সমুদ্রপথের প্রধান রক্ষক, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা দিতেন এবং নৌযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিতেন।

🔹 ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ও উদাহরণ:
‘মীর বহর’ এর দায়িত্বে থাকা প্রথম ঐতিহাসিক পদবী হিসেবে উল্লেখযোগ্য সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজী (১২১২–১২২৭ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি বাংলায় নৌবহর গঠন করার মধ্যদিয়ে এর কার্যকারিতা প্রতীয়মান হয়েছিল। এছাড়া সুবাহদার ইসলাম খান চিশতি (১৬০৮–১৬১৩) খ্রিঃ পর্যন্ত ‘মীর বহর’ এর মাধ্যমে বাংলা প্রদেশে নৌবহরের গুরুত্ব ব্যাপক প্রসার করেন।

মুঘল আমলে, বিশেষ করে আকবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত ‘মীর বহর’ ছিল নৌবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তা। মুুঘল শাসনামলে সম্রাট আকবরের অধীনে নৌ বাহিনীর জন্য নির্ধারিত দপ্তরের দায়িত্ব মীর-ই-বহর (মীর বহর) নামের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপর ন্যস্ত ছিল। পরবর্তীকালে ‘মীর বহর’ এর দপ্তর সামরিক বাহিনীর শক্তির আধার হিসেবে পরিগণিত হয়। এছাড়া সাফল্যজনক কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘মীর বহর’ তার দক্ষতার ছাপ রাখেন। প্রদেশের সরকার ব্যবস্থার কাজ কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থার মতই পরিচালিত হত। গভর্নর ছাড়াও প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে নিজস্ব দীউয়ান, বকসী, মীর আদল, সদর, মীর বহর, কোতয়াল প্রভৃতি পদ সমূহ ছিল। প্রদেশের মীর বহর তাঁর এখতিয়রিভুক্ত সীমানার মধ্যে নদী ও সমুদ্রবন্দর নিয়ন্ত্রণ করতেন। ‘মীর বহর’ এর দায়িত্ব শুধু সরাসরি সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তা বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কাজের সাথেও সম্পৃক্ত ছিল।

🔹 ইতিহাসে মীর বহর এর ভূমিকা:
বাংলার সুবেদাররা (বিশেষ করে মুঘল আমলে) ‘মীর বহর’ নিয়োগ করতেন। সুবেদার শাহ সুজা (শাহজাহানের ছেলে, বাংলার সুবেদার) পালানোর সময় তাঁর সাথে একজন ‘মীর বহর’ ছিলেন, যিনি তাঁর নৌসেনা পরিচালনা করতেন। সুবেদার শাহ সুজা আরাকান পর্যন্ত যাত্রার সময় ‘মীর বহর’ এর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ঢাকায় অবস্থানরত নওয়ারার ‘মীর বহর’ কে আরাকান, মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের উপুর্যুপরি আক্রমণ ও লুণ্ঠনের হাত থেকে ঢাকা সহ বাংলার বিভিন্ন নদী বন্দরগুলো কে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হত। মূলত মুঘলদের সার্বিকভাবে নদীবন্দর ও সমুদ্র বন্দরগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করাই ছিল ‘মীর বহর’ এর প্রধান দায়িত্ব।

🔹 বাংলায় শাহ সুজার আগমন ও মীর বহর এর ভূমিকা:
মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলার সুবেদার ও মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র) আওরঙ্গজেবের সাথে বিরোধে পরাজিত হয়ে বাংলার সিংহাসন হারান এবং তখন তিনি স্বপরিবারে, সেনা ও বিপুল ধনরত্ন নিয়ে আরাকান (বর্তমান রাখাইন, মিয়ানমার) পালিয়ে যান। এই পালানোর সময় তাঁর প্রধান নৌ-অধিনায়ক ছিলেন একজন ‘মীর বহর’। মূলত আরাকান পর্যন্ত শাহ সুজার পরিবারকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন।


🔹 সুজাবাদ গ্রামের গোড়াপত্তন:
মুঘল রাজপুত্র এবং বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বাংলার দক্ষিণাঞ্চল বরিশাল-ঝালকাঠির ঠিক মধ্যভাগে বর্তমান নলছিটি উপজেলার ২নং মগর ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে চলা সুগন্ধা নদীর পাড়ে দুটি কেল্লা নির্মাণ করেন। বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তার ভাই আওরঙ্গজেব এর রোশানল থেকে রক্ষা পেতে এখানে এই কেল্লা দু’টি নির্মাণ করেন। যা তার আত্মগোপন ও আত্মরক্ষার মূল কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মূলত সুজাবাদ কেল্লা বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার অন্তর্গত একটি বিলুপ্ত ঐতিহাসিক মুঘল স্থাপনা।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মগ ও বর্মী জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তার ভ্রাতা শাহ্ সুজাকে বরিশাল অঞ্চলে প্রেরণ করেন। জনশ্রুতি অনুসারে জানা যায়, কেল্লা দু’টি একরাতের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণে এ কেল্লা ভূতের কেল্লা নামেও পরিচিত। বরিশাল-ঝালকাঠি মহাসড়কের মাঝামাঝি দক্ষিণ পাশে গৌরবময় অতীতের শৌর্যবীর্যের কাহিনী ধারণ করা ঐতিহাসিক কেল্লার অতি সামান্য চিহ্নই বর্তমানে চোখে পড়ে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে শাহজাদা সুজা ১৬৫৪ সালে সুজাবাদ গ্রামের পত্তন করেন। যা সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই শাহ সুজার নামানুসারে সুজাবাদের কেল্লা হিসেবে এর নামকরণ করা হয়। শাহজাদা সুজা তার ভাই আওরঙ্গজেবের দ্বারা গৃহবন্দী ও যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এই কেল্লায় আশ্রয় নেন। কেল্লাদ্বয়ের একটি মাটি এবং অন্যটি ইট দ্বারা তৈরি করা। কেল্লা দুটি এখন ধ্বংসপ্রায়। উল্লেখ্য, শাহজাদা সুজার নাম অনুসারে বর্তমান সুজাবাদ গ্রামের নামকরণ করা হয়।


🔹 মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন:
মুঘল শাসনামলের শেষদিকে ঝালকাঠি অঞ্চল মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের লুণ্ঠনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। যার সত্যতা মিলে সেবাস্টিয় ম্যানরিক নামে এক পর্তুগিজ মিশনারি ও পর্যটকের লেখায়। ফ্রে সেবাস্টিয় ম্যানরিক ছিলেন মূলত একজন খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক। তিনি বিদেশে অবস্থিত খ্রিস্টান মিশনগুলি পরিদর্শন করতেন। অগাস্টান চার্চ তাঁর ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ভারত ভ্রমণকালে ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পর্তুগিজ ক্যাথোলিক চার্চ পরিদর্শনকল্পে ঢাকায় আসেন। তিনি তৎকালীন সময়ে তার ডায়েরিতে এ অঞ্চলের মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের লুণ্ঠনের ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, পর্তুগিজ এবং আরাকানি জলদস্যুদের অসহনীয় উৎপাতের কারণে এই অঞ্চল জনশূন্য ভূমিতে পরিণত হয়েছিলো। দক্ষিণাঞ্চলের ত্রাস দুর্দমনীয় এই বাহিনীকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে শাহজাদা সুজা ১৬৫৪ সালে সুজাবাদ গ্রামের পত্তন করেন এবং জলদস্যুদের দমন এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে সুজাবাদ গ্রামে দু‘টি কেল্লা নির্মাণ করেন। মূলত মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন করতেই মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজা এই কেল্লা দু’টি নির্মাণ করেন।

🔹যুদ্ধে শাহ সুজার পরাজয়:
১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর মুঘল সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সমগ্র সাম্রাজ্যে গুজব রটে যে সম্রাট মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর বড় পুত্র দারাশিকো সিংহাসনে তাঁর অবস্থান দৃঢ়করণের জন্য তা গোপন রেখেছেন। বাকি তিন যুবরাজ সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী অভিমুখে যাত্রার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজা রাজমহলে নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন ও রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেন। গঙ্গা নদীতে বহু সংখ্যক যুদ্ধের নৌকা সজ্জিত করে বিরাট বাহিনী নিয়ে তিনি রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হন। বাহাদুরপুরে তুমুল যুদ্ধে (আধুনিক উত্তর প্রদেশ, ভারত) দারার বাহিনীর হাতে শাহ সুজা পরাজিত হলে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য শাহ সুজা আবার রাজমহলে ফিরে আসেন। ইতোমধ্যে আওরঙ্গজেব দু’বার (ধর্মাট ও সামগড়ে) দারাকে পরাজিত করেন এবং তাঁকে বন্দি ও হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। অন্যদিকে শাহ সুজা আবারও রাজধানী অভিমুখে অগ্রসর হন।

এবার তাঁর অভিযান ছিল আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি খাজোয়াতে (ফতেহপুর জেলা, উত্তর প্রদেশ, ভারত) যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধেও সুজা পরাজিত হন এবং তিনি বাংলার দিকে পশ্চাদপসরণ করেন। মীরজুমলার অধীন রাজকীয় বাহিনী দ্বারা ভীষণভাবে শাহ সুজা তাড়িত হলেও প্রতিটি জায়গায় তাদেরকে বাধা দিতে থাকেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত যুদ্ধে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন।

🔹 শাহ সুজার বাংলা এবং ভারতবর্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত:
মুঘল রাজপুত্র এবং বাংলার সুবেদার শাহ সুজা যখন বুঝতে পারলেন চারদিক থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে এবং তার পক্ষে আর সৈন্য পুনর্গঠিত করা সম্ভব নয়, তখন তিনি চিরকালের জন্য বাংলা এবং ভারতবর্ষ ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তিনি আরাকানে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি স্বপরিবারে এবং দলবল নিয়ে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল তান্ডা ত্যাগ করে এপ্রিলের ১২ তারিখে ঢাকা পৌঁছেন। ৬ মে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ১২ মে ভুলুয়াতে দলবল নিয়ে আরাকানের পথে জাহাজে ওঠেন। বাংলা ত্যাগের পূর্বেই শাহ সুজা আরাকানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল প্রথমে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে পারস্য বা তুরস্কে গমন। কিন্তু মে মাসে সমুদ্র উত্তাল থাকায় এবং বর্ষা মৌসুম হওয়ায় তিনি কয়েক মাসের জন্য আরাকানে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং জাহাজ জোগাড় করার জন্য আরাকান রাজার সাহায্য চান। উল্লেখ্য, ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী ১৬৬০ সালে মুঘল রাজপুত্র শাহ সুজা তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে আরাকানে পালিয়ে যান। আরাকানের রাজধানী ম্রোহং (ম্রৌকউ) পৌঁছলে রাজা তাঁর মন্ত্রিমন্ডলীর মাধ্যমে শাহ সুজাকে সাদরে গ্রহণ করেন। শহরের উপকণ্ঠে থাকার জন্য তাঁকে একটি বাড়িও দেওয়া হয়। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে ততই অতিথির প্রতি রাজার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে।


🔹 শাহ সুজার স্বপরিবারে মৃত্যু:
শাহ সুজার সঙ্গে নীত সম্পদ হস্তগত করা বা সুজার সুন্দরী ও সংস্কৃতিবান মেয়েদের একজনকে পত্নী হিসেবে পাওয়ার অভিলাষ থেকে শাহ সুজার সঙ্গে রাজার বিরোধ বাধে। সুজাকে তাঁর পরিবার ও দলবলসহ নিপীড়ন করে মারা হয়। শুধু সামান্য কয়েকজন গ্রামাঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে নিদারুণ হত্যাযজ্ঞ থেকে নিস্তার পায়। কিন্তু কোন মুঘল রাজকুমার বা রাজকুমারী জীবিত ছিলেন না। আরাকান রাজার বিশ্বাস ঘাতকতায় ও অত্যাচারে বাংলার সুবেদার মুঘল সম্রাট শাহ সুজা, তার পরিবার ও বহু নৌ সেনা নিহত হন। ভারতবর্ষের ইতিহাসের তথ্যমতে শাহ সুজা ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে খুন হন। এছাড়া তার ছেলেদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তার স্ত্রী পিয়ারি বানু বেগম এবং তার দুই মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আরেক মেয়ে আমিনা বানু বেগমকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়, যেখানে শোক থেকে তিনি মারা যান।

🔹 বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে মীরবহর এর আগমন:
ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও লেখা থেকে প্রতিয়মান হয় যে, মুঘল রাজপুত্র এবং বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অধিনে মূলত একজন ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ নিযুক্ত ছিলেন। যিনি তার খুবই বিশ্বস্ত ও অনুগত ছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করেছেন। সুজাবাদ গ্রামে শাহ সুজা অবস্থানকালে কেল্লা নির্মাণ সময়ে তার বিশ্বস্ত ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ পদে ভূষিত সেই নৌ প্রধান কর্মকর্তা তার সঙ্গে ছিলেন বলে ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য সূত্রে পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভারতবের্ষের মুঘল ইতিহাসের পথ পরিক্রমার তথ্যমতে, তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একজন দক্ষ ও দূরদর্শী ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ মুঘল রাজপুত্র ও বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অধীন্যাস্ত ছিলেন। ধারণা করা হয় বাংলার সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলের কোন এক সময় সুবেদার শাহ সুজার সেই ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলের জেলা ঝালকাঠিতে বসতি স্থাপন করে বসবাস করতে শুরু করেন। মূলত ‘মীর বহর’ একটি রাজকীয় উচ্চ বংশীয় পদবী। যা মুঘল সম্রাটরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উচ্চপদস্থ নৌ কর্মকর্তার সাহসিকতা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতা কারণে ‘মীর বহর’ উপাধীতে ভূষিত করেছেন।

🔹 সুজাবাদ গ্রামে মীর বহরদের বসবাস:
বর্তমানে তারা বরিশাল-ঝালকাঠির মাঝামাঝি স্থানে সুজাবাদ গ্রামে শাহজাদা সুজা কর্তৃক নির্মিত সুজাবাদের কেল্লার খুব কাছেই সুগন্ধা নদীর তীরে অবস্থিত অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও স্বনামধন্য মুসলিম পরিবার হিসেবে পরিচিত ‘মীর বহর’ বাড়িতে বসবাস করে আসছেন। এছাড়া তারা দীর্ঘদিন যাবৎ অত্যন্ত প্রভাব, প্রতিপত্তি ও সুনামের সাথে ঐ এলাকায় বসবাস করে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে তারা ঐ এলাকায় বেশ প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তারা সুজাবাদ গ্রামে অত্যন্ত প্রতাপের সাথে জীবনযাপন করছেন। তাদের আচার আচরণ অনেকটা রাজকীয় ধাচের এবং তারা সবার সাথে খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন। ‘মীর বহর’ বাড়িতে তৎকালীন সময়ের তৈরি একটি অতি পুরাতন দালানঘর রয়েছে। যা সেই সময়ে ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। যার আনুমানিক বয়স অন্তত ১২০ বছর। লোকমুখে জানা যায়, এই দালানঘরটি সুজাবাদ গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন একটি স্থাপনা। যা শত বছরের বেশি ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে দাড়িয়ে আছে। তৎকালীন সময় থেকে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে বসবাস করা ঝালকাঠি জেলার ‘মীর বহর’ পরিবারের ধারাবাহিক নামগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

মোঃ রিসালাত মীর বহর এর পূর্বপুরুষদের নামের তালিকা:
◉ মৃত মোহাম্মদ মাহমুদ এ.আর মীরবহর এর পুত্র
◉ মৃত মোহাম্মদ নজর মাহমুদ মীরবহর এর পুত্র
◉ মৃত মোহাম্মদ বরু মীরবহর এর পুত্র
◉ মৃত মোহাম্মদ মিঞাজান মীরবহর এর পুত্র
◉ মৃত মোহাম্মদ বজলুর রহমান মীরবহর এর পুত্র (তার দাদার বাবা)
◉ মৃত মোহাম্মদ আলহাজ্ব মুজাফফর আলী মীরবহর এর পুত্র (তার দাদা)
◉ মৃত মোহাম্মদ শাহ্ জাহান মীরবহর (তার বড় কাকা)
◉ মৃত মোহাম্মদ বারেক মীরবহর (তার মেজ কাকা)
◉ মোহাম্মদ শাহ্ আলম মীরবহর (তার সেজ কাকা)
◉ মোহাম্মদ শাহ সিদ্দিক মীরবহর (মোঃ রিসালাত মীরবহর এর বাবা)
◉ মোহাম্মদ শাহ্ জামাল মীরবহর (তার কাকা)
◉ মোঃ শাহ্ জালাল মীরবহর (তার কাকা)

মুঘল শাসনামলে ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ পদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। যা বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষে মুঘল শাসন ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সুসংহত করেছে। বিশেষ করে মুঘল শাসকরা উচ্চপদস্থ ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ এর সাহিসিকতা, দূরদর্শীতার ও সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে ‘মীর বহর’ উপাধীতে ভূষিত করেন। তাই ভারতবর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গোটা মুঘল শাসন আমল কে ‘নৌবাহিনীর প্রধান’ বা ‘অ্যাডমিরাল’ অর্থাৎ ‘মীর বহর’ ঐতিহাসিকভাবে অলংকারিত করেছে। যা মুঘল শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ পরিচালনায় তাদের গুরুত্বকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে তৎকালিন সময়ে ‘মীর বহর’ এর দায়িত্ব শুধু সরাসরি সামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তা বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে বিশেষ অবদান রাখে।

উল্লেখ্য, মুঘল শাসনামল ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেক্ষাপট। যা ১৫২৬ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সময়ে, মুঘল সম্রাটরা ভারতীয় উপমহাদেশে একটি বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেন এবং তাদের শাসনামলে স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছিল। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আকবরের শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে (১৫৫৬-১৬০৫) মুঘল সাম্রাজ্য একটি সুসংহত অবস্থায় আসে এবং এই সময়কে মুঘল শাসনের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শাহজাহানের (১৬২৭-১৬৫৮) শাসনামলে তাজমহল নির্মিত হয়েছিল, যা মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ।

তবে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে সাম্রাজ্যের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হতে থাকে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট, এবং মারাঠা ও ব্রিটিশদের উত্থান মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটায়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের ক্ষমতা সুসংহত করে এবং ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

তথ্যসূত্র: উল্লেখিত তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে যে সকল বই বা ওয়বসাইটের তথ্যগুলোকে লেখায় সূত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর নাম নিচে দেওয়া হলো।

গ্রন্থপঞ্জি: ভারতের ইতিহাস, লেখক: অতুল চন্দ্র রায়, প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায়, JN Sarkar, ed, History of Bengal, vol. II, Dacca University, Dhaka, 1948; JN Sarkar, History of Aurangzib, vol. II, Orient Langman Reprint, New Delhi, 1972-74; Abdul Karim, History of Bengal, Mughal Period, vol. II, Rajshahi University, Institute of Bangladesh Studies, Rajshahi, 1995.

ওয়েবসাইট সূত্র: বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বরিশাল পিডিয়া, ইউটিউব।

সুজাবাদ গ্রামে মীর বহর বংশ সম্পর্কে বাংলাদেশী গ্রন্থ:
◉ বরিশাল বিভাগের ইতিহাস (প্রথম খন্ড: ১৯৮২ খ্রিঃ ও দ্বিতীয় খন্ড: ১৯৮৫ খ্রিঃ) লেখক: সিরাজ উদদীন আহমেদ এর লেখা বইয়ের ১৭ অথবা ১৯ পৃষ্ঠায় সুজাবাদ গ্রামের “মীর বহর” বংশের বিষয়ে লেখা রয়েছে।

Writer & Editor। Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +88 01516332727 (What's App)