এ দেশ দূর্ণীতিবাজদের, চাঁদাবাজদের, ছিনতাইকারীদের, ধর্ষকদের, টেন্ডারবাজদের, ঘুষখোরদের, ভূমিদস্যুদের, অর্থ পাচারকারীদের, জাল জালিয়াতদের, সুদ খোরদের, চোরদের, টাউটদের, বাটপারদের, মিথ্যাবাদীদের, মামলাবাজদের, মাদকাসক্তদের, ইভটিজারদের, তদবিরকারীদের, হেনস্থাকারীদের, অন্যায়কারীদের, অর্থ আত্মসাৎকারীদের, দলকানাদের, দালালদের, দখলদারদের।
একটা সমাজ বা একটা রাষ্ট্র একদিনে নষ্ট হয় না। দীর্ঘদিনের অপশাসন, বিচারহীনতা, দলীয়করণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনের ফাকফোকর, অবৈধ ততবির আর অন্যায়কারীদের স্বার্থে কাজ করার ফল হচ্ছে আজকের এই দেশ, আজকের এই সমাজ। যাতে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ নীরিহ মানুষ। গোটা ব্যবস্থাই যেন শ্বাসরোধ করে মারছে সাধারণ মানুষদের। একজন মানুষ যখন অন্যায় করে তার সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় না। অথবা করলেও ফাকফোকর দিয়ে আবার সে বের হয়ে যায়। ফলে নতুন করে আবার অন্যায় করার সাহস ও সুযোগ দুটোই পায়। অথচ নিরপরাধ অনেক মানুষ আছেন যারা সমাজে বিভিন্ন ভাবে হয়রানী হয়। তখন দেখবেন এই হয়রানির পিছনে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামো কিভাবে কাজ করে। এই হয়রানি থেকে পরিত্রাণ পেতে কিংবা সমাধানের জন্য আপনাকে বিভিন্ন দপ্তরের টেবিলে টেবিলে কেমন ভিক্ষুকের মত ঘুরে বেড়াতে হয়।
আপনার জমি, আপনার ঘর, আপনার বাপ দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি, বৈধ কাগজ আছে তারপরেও তা প্রমাণ করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। কিছুদিন আগে টিভি চ্যানেলে দেখলাম একজন ব্যক্তি জীবিত অথচ সেটা প্রমাণ করতে তাকে বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে বেরাতে হচ্ছে। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে চিৎকার করে জগতবাসীকে বলতে হচ্ছে আমি মৃত না আমি জীবিত। একবার ভাবুন তো আপনি জীবিত থাকতে মৃত কেমন লাগবে? এভাবে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না। দিনের পর দিন মানুষ হয়রান হয়ে যায় কিন্তু সঠিক বিচার পায় না। সঠিক বিচারের জন্য আজ যেন মানুষ হণ্যে হয়ে ঘুরছে। চারদিকে যেন হাজারো সমস্যা আর সমস্যা। সমস্যাগুলো কমছে না বরং দিন দিন আরও নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। একলক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের একটি ছোট দেশ আজ যেন বিচারহীনতায়, বিশৃঙ্খলায় ভুগছে আর ধুকছে। গোটা সমাজ যেন ভরে গেছে জুলুমবাজদের দখলে।
নৈতিক শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, অসৎ সঙ্গ, বিশৃঙ্খল জীবন যাপন, ধর্মীয় অনুভূতির অভাব সহ বিভিন্ন কারণে দিন দিন মানুষ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। যা আমাদের সবার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনকে বিঘ্নিত করছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? কি করলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এর কোন উত্তর হয়তো কারও জানা নেই। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একথা স্বীকার করতেই হয় যে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা আমাদের প্রতিনিয়ত নিঃশ্বেস করে দিচ্ছে। একটি সমাজ ও দেশ সত্যিকার অর্থে তখনই উন্নত হয়ে উঠবে যখন সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসকারী সবাই ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। আপনি যতবেশি অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবেন তত বেশি অন্যায় বাড়তে থাকবে। এত বেশি বাড়তে থাকবে যা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। আর মানুষের দ্বারা সমাজ বা দেশ যদি একবার দূষিত হয় তবে কোন কিছুই ঠিক রাখা সহজ বা সম্ভব হবে না।
আপনি হাজারো আইন আদালত বসিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না, যদি না প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ সঠিক বিচারের আওতায় আনা না যায়। বিচার প্রক্রিয়া যত জবাবদিহিতা মূলক ও স্বচ্ছ হবে অপরাধীরা তত বেশি ভীত ও সন্ত্রস্ত হবে। ফলে অপরাধের মাত্রা কিংবা প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে। মূলত নৈতিক শিক্ষার অভাবে সামাজিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে। যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। আর এই অবক্ষয়কে ঠেকাতে নৈতিক শিক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
কাজেই নাগরিকদের অপরাধ প্রবণতাকে রুখতে শুধু আইন নয় বরং নৈতিক শিক্ষা প্রসারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একজন মানুষ যদি নৈতিক, আদর্শগত ও সৎভাবে তৈরি না হয় তাহলে তার দ্বারা রাষ্ট্রে যে কোন অন্যায় প্রতিষ্ঠা করা খুব সহজ সাধ্য বিষয় হয়ে দাড়ায়। ফলে কোন ভাবেই তা আপনি বা আমি রোধ করতে পারবো না। মানুষ যদি দেশপ্রেমিক না হয় তবে তার ফল অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সর্বোচ্চ শিক্ষাকে নয় বরং সর্বোচ্চ নৈতিকতাকে প্রাধাণ্য দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ বিদ্যান লোক যদি বিদ্যা অর্জন শেষে দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তবে তা গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে যদি আমরা দূর্ণীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ি তবে সেই শিক্ষা আমাদের জন্য আশির্বাদ নয় বরং অভিশাপ হয়ে দাড়ায়। রাষ্ট্রকে সচল রাখতে আমরা শিক্ষিত লোকদের বিভিন্ন পদে বসাই। অথচ দিন শেষে তারাই জড়িয়ে পড়ে নানা অপকর্মে। তাই শিক্ষা নয় বরং নৈতিকতাকেই সমাজের এসব অপকর্ম আর অপরাধ প্রবণতাকে রুখতে প্রাধান্য দিতে হবে। অর্থাৎ সমাজের আমূল পরিবর্তন করতে হলে আদর্শীক জীবনচিন্তা ও নৈতিকতার কোন বিকল্প নেই। তাই রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নৈতিকতার মানদন্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে যাতে করে সমাজে বিরাজমান বিভিন্ন অন্যায় ও অপরাধ থেকে সাধারণ মানুষগুলো নিস্তার পায়।
১৯৪৭ সালে কবি রফিক আজাদ তার কবিতায় তৎকালিন সমসাময়িক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলেন, ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ক্ষুব্ধ ও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে এই পঙ্ক্তিটি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। আজ যদিও মনে হচ্ছে ভাতের সেই ক্ষুধা নেই। কিন্তু আজ আমাদের অমানুষ হওয়ার ক্ষুধায় ধরেছে।
বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য’র লেখা বিখ্যাত একটি পঙ্ক্তি হচ্ছে- ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। তার লেখা ‘হে মহাজীবন’ কবিতা থেকে এটি নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই পঙ্ক্তি দ্বারা কবি এটা বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের পেটে যখন তীব্র ক্ষুধা থাকে, তখন তার কাছে আকাশের চাঁদের সৌন্দর্য বা রোমান্টিকতার কোনো মূল্য থাকে না। মূলত, চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার কাছে সমস্ত নান্দনিকতা যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে। কবি এই লাইনটির মাধ্যমে সেই নির্মম বাস্তবতাকেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
তো আমাদের এখনকার নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য যা যা দরকার আমাদের সবই আছে। যেমন: খাদ্য আছে, বস্ত্র আছে, বাসস্থান আছে, শিক্ষা আছে, চিকিৎসা আছে, সরকার আছে, নির্দিষ্ট ভূখন্ড আছে। কিন্ত নেই কেবল সুনাগরিক, নেই সঠিক বিচারব্যবস্থা, আইন আছে প্রয়োগ নাই অথবা আমরা আইন মানছি না। বিদ্যার্জনের জন্য নামীদামী স্কুল আছে কলেজ আছে কিন্তু নৈতিকতা নাই। মানুষ যদি মানুষ না হয়ে ওঠে তবে তার দায়ভার আপনি কাকে দেবেন?
একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা নিজ শিক্ষাকে, ক্ষমতাকে, অসৎ উপায় কে পুজি করে দিন আর দিন টাকার পাহার গড়ছে। কিন্তু দেখবেন নৈতিকতা কে খুব কম মানুষ আছে যারা পুজি করে। কারণ নৈতিকতার মাঝে তো আর অর্থ নাই। যা দিয়ে তিনি বেশ আয়েশী জীবন পাড় করতে পারবেন। তবে সত্যিকারের একজন নৈতিক ও আদর্শিক মানুষ সবসময় মাথা উচু করে বাঁচে।
আসুন আমরা নিজেদের পরিবর্তন করি। সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করি। সমস্ত প্রকার অন্যায় অনাচার থেকে বিরত থাকি। সত্যিকারের একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করি। সবাইকে সত্যিকারের দেশ প্রেমিক হতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের কল্যাণে কাজ করে যেতে হবে। তবেই তো দেশ হবে উন্নত আর স্বনির্ভর। দেশ ও মানুষের ক্ষতি হয় এমন অপকর্ম বা অপরাধ থেকে সবাই বিরত থাকি। আসুন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি। মানুষকে ভালোবাসি। শৃঙ্খলা বজায় রাখি। মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাই। আগামী দিনের অনাগত শিশুদের কে পৃথিবীর বাসযোগ্য করে তুলি।
লেখক: মোঃ রিসালাত মীরবহর
সম্পাদক, অবেলার ডাক সবার জন্য সাহিত্য
বরিশাল, বাংলাদেশ।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে: ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন [Click]।
📌 সম্ভব হলে পোস্টটি শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন।
✅আজ এ পর্যন্তই, ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
Writer & Editor: Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]
E-mail: obalardak@gmail.com
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]




.png)