মোঃ রিসালাত মীরবহর।। আমিও তোমাদের মতো মানুষ ছিলাম। তোমাদের ঐ পৃথিবীর বাসিন্দা ছিলাম। তোমাদের মতো হাটতাম, কথা বলতাম, বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতাম। ছোটবেলাতে কত হাসি, তামাশা আর খেলাধুলার মধ্যে দিয়ে সময় কেটেছে আমার। কত মানুষের সাথে দেখা হয়েছে, কত মানুষের সাথে কথা হয়েছে তার কোন শেষ নেই। নিজের স্বাধীন মতো চলেছি। কেউ বাঁধা দেওয়ার মতো ছিল না। আবার কেউ বাঁধা দিতে গেলেও তার কথা শোনার মতো সময় ছিল না। কত মিথ্যা কথা বলেছি, কত নারকেল চুরি করে খেয়েছি, মানুষকে ঠকিয়েছি। মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করেছি, মানুষের ন্যায় কথার কারণে তাদের হেনস্থা করেছি। সুদে টাকা এনেছি, আত্মীয়ের হক আদায় করিনি, অফিসে বাড়তি আয় করতে গিয়ে ঘুষ গ্রহণ করেছি। অন্যায় ভাবে মানুষকে জিম্মি করে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছি।
কারও জমি নিজের নামে করতে গিয়ে অফিসের বাবুদের ঘুষ দিয়েছি। মানুষের আমানতের খেয়ানত করেছি। অহেতুক ঝগড়া বাধিয়ে মামলায় প্রতিপক্ষকে ফাসিয়েছি। মোটা অর্থের বিনিময়ে উকিল কে দিয়ে মিথ্যা লিখেয়ে নিজের পক্ষে রায় এনেছি, এতিমের হক নষ্ট করেছি। রাস্তায় কোন মেয়ে মানুষ দেখলে তাকে অহেতুক উত্যক্ত করেছি। মসজিদের নির্দোষ ইমাম কে গালি দিয়েছি। বন্ধুদের দিয়ে অন্যের জমি দখল করেছি। গরীবের উপর অত্যাচার করেছি। অন্যায় ভাবে নিজের স্ত্রীকে দিয়ে বাপের বাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা নিয়ে এসেছি। নেতার ভালোবাসা পেতে তার চাটুকারিতা করেছি। থানায় টাকা দিয়ে অন্যের বাড়িঘরে হামলা করেছি। এমনকি নির্দোষ মানুষকে জেল খাটিয়েছি।
অন্যের বাসায় রাতে চুরি করিয়েছি। মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে ব্লাক মেইল করেছি। টাকা ধার নেওয়ার কথা বলে সে টাকা আর শোধ করিনি। শিক্ষক কে তার প্রাপ্য সম্মান করিনি। বাবা-মায়ের সাথে দুব্যবহার করেছি। তাদের উপদেশগুলো মেনে চলিনি। নিজের খেয়াল খুশি মতো চলেছি। সময় মতো নামাজ আদায় করিনি। মাদকের নেশায় মাতাল ছিলাম। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের কে ইভটিজিং করেছি। আত্মীয়ের সাথে অজথা ঝগড়া বিবাদ করেছি। তাদের কে অকারণেই বিভিন্ন সময় হেনস্তা করেছি। দোকান থেকে বাজার নিয়ে সে টাকা আর পরিশোধ করিনি। সমাজে ন্যায়কে দমিয়ে দিয়ে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করেছি। নিজের স্বার্থে অহেতুক নির্দোষ মানুষকে অপবাদ দিয়ে তাকে সমাজ ছাড়া করেছি। সোস্যাল মিডিয়ায় খারাপ ছবি দেখে অবসর সময় কাঠিয়েছি।
আজ আমি নরক থেকে বলছি। প্রকৃতি কখনও কাউকে ক্ষমা করে না। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্য। অল্প সময়ের জন্য তিনি আমাদের পৃথিবীতে পাঠান। জন্ম থেকে মৃত্যু। এই সময়টা আমরা না বুঝে অনেক প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজে লিপ্ত হই। যা মানুষের অনেক ক্ষতি বয়ে আনে।আজ আর পৃথিবীতে নেই। মৃত্যুর পর আমার নাম দিয়েছে মানুষ লাশ। অন্ধকার চারদিকে অন্ধকার। আছে ভয়কংর বিছু, সাপ আর নানা হিংস্র জীব জানোয়ার। আগুনের কি লেলিহান শিখা। প্রতিটি অন্যায়ের হিসেবে নিকেশ হচ্ছে। সে অনুযায়ী বিচার। কি ভয়ংকর দেখতে। কাতারে কাতারে মানুষের হাহাকার। দল বেধে সব যাচ্ছে নরকে। কেবল ধ্বনিত হচ্ছে বাঁচাও বাঁচাও। কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছে। আর অনেকে বলছে হে আল্লাহ আমাকে আবার পৃথিবীতে পাঠান। আমি আবারও পৃথিবীতে যেতে চাই।
মানুষগুলো ছুটছে যেন নিজকে বাঁচাতে। আগুনের উপর দিয়ে হাটছে। আগুনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে। নরক যন্ত্রণা যে কত ভয়ংকর তা যদি পৃথিবীর মানুষ বুঝতো তবে তারা সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকত। এখানে প্রচন্ড তাপ। সহ্য করা যায় না। আবার প্রচন্ড শীত। তাও সহ্য করা যায় না। হিংস্র জীবজন্তুগুলো এসে হানা দিচ্ছে। ছো মেরে মানুষগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে। আহা্ কি ভয়ংকর দৃশ্য। যার যেমন অপরাধ তার তেমন শাস্তি।
পুলসিরতের উপর দিয়ে পাড়ি দিচ্ছে মানুষ। কেউ কেউ সে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কেটে কেটে নিচে পড়ে যাচ্ছে। নীচে গভীর খাদ। কোন কূল কিনারা নেই। যে যার মতো করে বাঁচার চেষ্টা করছে। আর কেবল ভিক্ষে চাইছে একটু ক্ষাণী নেক আমল। অনেকে আবার তাকিয়ে আছে পৃথিবীর মানুষের দিকে। কখন তার জন্য একটু খানি দোয়া আসবে। আসামাত্রই তা জমিয়ে রাখছে। এভাবে কেটে যাচ্ছে অনন্তকাল।
আমি নরক থেকে বলছি। তোমরা সব অপকর্ম আর পাপাচার ছেড়ে দাও। না হলে কবরে ভয়ংকর বিপদে পড়তে হবে। ভোগ করতে হবে কঠিন শাস্তি। সময় থাকতে তওবা করে নাও। আল্লাহ মহান ও দয়ালু। তার কাছে আশ্রয় চাও। নিশ্চই তিনি ক্ষমা করে দিবেন। নামাজ পড় সময় মতো। মিথ্যা কথা, প্রতারণা থেকে শুরু সব অপকর্ম আজই ছেড়ে দাও। এখানে অনেক কষ্ট, অনেক যন্ত্রণা। ফিরে এসো মহান আল্লাহর পথে। হয়তো এখন ভাবছো মৃত্যু নেই। কিন্তু তোমার এ ধারণা ভুল। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন- كُلُّ نَفْسٍ ذَآىِٕقَةُ الْمَوْتِ ؕ (অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। যে কোন প্রাণীই হোক তার উপর মৃত্যু একবার আসবেই। ভালো হোক খারাপ হোক তাকে মরতে হবে)
কিয়ামতের দিন কোনো ব্যক্তি তার কৃতকর্মের হিসাব এড়িয়ে যেতে পারবে না। ভালো ও মন্দ কাজ যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, পরকালে তার হিসাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না এবং কাজ যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও হয়, তবু তা আমি উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৪৭)
ইহকালে মানুষ অপরাধ করার পর আত্মগোপন করে থাকে, কিন্তু পরকালে মানুষ আত্মগোপন করে থাকার সুযোগ পাবে না। সেদিন বলা হবে, ‘হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।
পরকালে হিসাবের সময় মানুষের পূর্বাপর সব আমল উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে কী আগে পাঠিয়েছে এবং কী পেছনে রেখে গেছে।’ (সুরা : কিয়ামা, আয়াত : ১৩)
পরকালে কেউ নিজের আমলের হিসাব দিয়ে মুক্তি পাবে না। মানুষের মুক্তি মিলবে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৩৭)
তবে আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের হিসাব সহজ করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে।’ (সুরা : ইনশিকাক, আয়াত : ৭-৮)
বিপরীতে যারা অবিশ্বাসী ও অবাধ্য হবে, তাদের হিসাব হবে অত্যন্ত কঠিন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং যাকে তার আমলনামা তার পৃষ্ঠের পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে, সে অবশ্যই তার ধ্বংস কামনা করবে এবং জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : ইনশিকাক, আয়াত : ১০-১২)
তারপরই দুনিয়ার ব্যাপারে আফসোস করবে, হা-হুতাশ করবে। আর জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এসব বলতে থাকবে-
مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيهْ - هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيهْ - خُذُوهُ فَغُلُّوهُ - ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ - ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعًا فَاسْلُكُوهُ - إِنَّهُ كَانَ لَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ - وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ - فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ - وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ - لَا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِؤُونَ
‘আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো উপকারে এলো না। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল। ফেরেশতাদের বলা হবে- এদের ধর, গলায় বেড়ি পড়িয়ে দাও। অতপর নিক্ষেপ কর জাহান্নামে। অতপর তাকে শৃঙ্খলিত কর, সত্তর গজ দীর্ঘ এক শিকলে। নিশ্চয় সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না। আর মিসকিনকে খাবার দিতে উৎসাহিত করত না। অতএব, আজকের দিন এখানে তার কোনো সুহূদ নেই। আর কোনো খাদ্য নেই, ক্ষত-নিঃসৃত পুঁজ ব্যতিত। গোনাহগার ব্যতিত কেউ এটা খাবে না।’ (সুরা হাক্বকাহ : আয়াত ২৮-৩৭)
إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا - خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَّا يَجِدُونَ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا - يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا
নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্যে জলন্ত অগুন (জাহান্নাম) প্রস্তুত রেখেছেন। তথায় তারা অনন্তকাল থাকবে এবং কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। যেদিন আগুনে তাদের মুখমণ্ডল ওলট-পালট করা হবে; সেদিন তারা বলবে- হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রসূলের আনুগত্য করতাম। ( সুরা আহজাব : আয়াত ৬৪-৬৬)
Mobile: +88 01516332727 (What's App)