মাদকমুক্ত সুন্দর আগামীর খোঁজে

বিজ্ঞাপন: ০১

Type Here to Get Search Results !

বিজ্ঞপ্তি: ০১

বিজ্ঞাপন: ০২

মাদকমুক্ত সুন্দর আগামীর খোঁজে

চিন্তা-চেতনার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। প্রাচীনকাল থেকেই সাহিত্য সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে আসছে। একটি জাতির বিবেককে জাগ্রত করতে এবং সামাজিক অবক্ষয় দূর করতে কবি, সাহিত্যিক এবং লেখকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান যুগে আমাদের সমাজ যখন বিভিন্ন ধরনের নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি এবং মাদকের ভয়াল গ্রাসে নিমজ্জিত, তখন সুস্থ ধারার সাহিত্য চর্চা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজকে এই অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কোনও বিকল্প নেই। তারুণ্যের শক্তির সঠিক ব্যবহার না হলে দেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে বাধ্য। তাই যুবসমাজকে অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে এবং একটি সুন্দর আগামী গড়তে ‘আসুন মাদক ছাড়ি কলম ধরি, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ি’ অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি আন্দোলন।

মাদক বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় একটি অভিশাপ যা একটি সুপ্ত প্রজন্মকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তরুণরা যখন জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে কিংবা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখনই তারা এই মরণনেশার দিকে ধাবিত হয়। মাদক একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিই করে না, বরং এটি একটি পরিবার এবং সমাজকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তরুণেরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে। চুরি, ছিনতাই এবং কিশোর গ্যাং কালচার থেকে শুরু করে বড় বড় সামাজিক অপরাধের মূলে রয়েছে এই মাদকাসক্তি। মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণদের দূরে রাখতে হলে আইন প্রয়োগ বা বলপ্রয়োগ করাই যথেষ্ট হবে না। এর জন্য প্রয়োজন তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং মানসিক খোরাকের ব্যবস্থা করা। সৃজনশীল সাহিত্য চর্চা তরুণদের এই মানসিক খোরাক জোগাতে পারে। একজন তরুণ যখন নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে বা নিজের অনুভূতিগুলোকে কলমের মাধ্যমে কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তুলতে শুরু করে, তখন তার চিন্তাজগতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সৃজনশীলতা মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

কলমকে বলা হয় তরবারির চেয়েও শক্তিশালী। একটি ধারালো কলম অনায়াসে সমাজের হাজার বছরের কুসংস্কার, অন্যায় এবং দুর্নীতিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বড় বড় ক্রান্তিলগ্নে সাহিত্যিকদের কলমই সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিল এবং বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল। তরুণ প্রজন্ম যখন সমাজ ও দেশের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিজেদের গুটিয়ে না রেখে কলম হাতে তুলে নেবে, তখন এক নতুন সমাজ গঠনের সূচনা হবে। সাহিত্য চর্চা তরুণদের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। লেখার মাধ্যমে তরুণেরা তাদের ক্ষোভ, হতাশা এবং সমাজের বৈষম্যগুলোকে গঠনমূলকভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। এটি তাদের ধ্বংসাত্মক পথ থেকে সরিয়ে এক সৃজনশীল এবং কল্যাণকর পথের দিকে পরিচালিত করে। যখন একজন তরুণ মাদকের বিষাক্ত ধোঁয়া ছেড়ে সৃজনশীল কলমকে নিজের সঙ্গী করে নেয়, তখন সে নিজেকেই রক্ষা করে না, বরং পাশাপাশি তার আশেপাশের আরও দশজন তরুণকেও আলোর পথে আসার অনুপ্রেরণা দেয়।

দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ও এই কলম সৈনিকদের হাত ধরেই শক্তিশালী হতে পারে। দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। একটি সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে সর্বস্তরে সততা ও নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। সাহিত্য তরুণদের মধ্যে এই নৈতিক চেতনার বীজ বুনে দেয়। ছোটবেলা থেকেই যদি তরুণদের ভালো সাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, তবে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও সততার আদর্শ গড়ে ওঠে। লেখকেরা যখন তাদের গদ্য, কবিতা কিংবা প্রবন্ধের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন তা সমাজের নীতি নির্ধারকদের যেমন ভাবিয়ে তোলে, ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষকেও সচেতন করে। তরুণ লেখকদের লেখনীতে যখন দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব প্রকাশ পায়, তখন তা পুরো জাতির জন্য এক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে তরুণদের এই সৃজনশীল অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

তবে এই সুস্থ ধারার সাহিত্য চর্চাকে টিকিয়ে রাখা এবং তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যমের। বর্তমান যুগে তরুণদেরকে বই এবং সাহিত্যের দিকে ফিরিয়ে আনা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই সময়ে বিভিন্ন সৃজনশীল সাহিত্য সংগঠন, ম্যাগাজিন এবং অনলাইন পত্রিকাগুলো প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ধরনের মাধ্যমগুলো তরুণ সমাজকে তাদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। যখন একজন নতুন লেখক তার লেখা কোথাও প্রকাশিত হতে দেখেন, তখন তার সৃষ্টির আনন্দ বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং সে আরও ভালো কিছু করার প্রেরণা পায়। এই প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদেরকে একসঙ্গে কাজ করার, নিজেদের চিন্তাভাবনা বিনিময় করার এবং একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। এটি যুবসমাজকে অপসংস্কৃতি এবং অলস সময় কাটানো থেকে দূরে রাখে, যা পরোক্ষভাবে তাদের মাদক ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

সৃজনশীল সাহিত্য চর্চার আরেকটি বড় দিক হলো এটি তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমকে পুনরুজ্জীবিত করে। নিজের ভাষা এবং সংস্কৃতিকে ভালোবাসার মাধ্যমেই প্রকৃত দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তরুণেরা যখন নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বীরত্বগাঁথা নিয়ে পড়াশোনা করে এবং তা নিয়ে লেখে, তখন দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ আরও বেড়ে যায়। তারা বুঝতে পারেন যে এই দেশটিকে সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এই বোধটিই তাদের যে কোন ধরনের দেশবিরোধী বা অনৈতিক কাজ থেকে দূরে রাখে। মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এই দেশপ্রেমেরই প্রয়োজন। তরুণদের কলম যখন দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলবে, তখনই প্রকৃত অর্থে সাহিত্যের স্বার্থকতা ফুটে উঠবে।

পরিশেষে বলব, একটি সুস্থ, সুন্দর এবং সমৃদ্ধিশালী জাতি গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো তরুণ প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং সঠিক দিশা দেখানো আমাদের সকলের দায়িত্ব। মাদকের মরণনেশা এবং দুর্নীতির অন্ধকার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে সাহিত্য চর্চাকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের হাতে তুলে দিতে হবে জ্ঞানের আলো ও সৃষ্টির হাতিয়ার কলম। শব্দের শক্তিতেই দূর হবে সমাজের সব কালো মেঘ। তরুণদের এই সৃজনশীল পদচারণাই একদিন আমাদের উপহার দেবে একটি মাদকমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবিক বাংলাদেশ। নতুন ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যেখানে তরুণেরা হবে একেকজন আলোর দিশারী।

লেখক: আয়াজ আহমদ বাঙালি।
আসাম, ভারত।

বিজ্ঞাপন: ০৩ [Top]

বিজ্ঞাপন: ০৪ [Below]

বিজ্ঞাপন: ০৫

বিজ্ঞাপন: ০৬