পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ এসেছে। আবার অসংখ্য মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করেছে। আসা আর যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা আজও বহমান। মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়ে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা এই বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্যই মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়। এতো এতো ভালো গুণ থাকা স্বত্তেও আমরা কখনও কখনও আমাদের জীবনে হীনমন্যতায় ভুগী। শুধু তাই নয়, আমরা নিজেকে ভালোবাসার চেয়ে অন্যদের ভালোবাসতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সম্ভবত এজন্য আমরা আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি অসুখী অনুভব করি।
আবার কখনও কখনও আমরা আমাদের জীবনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যার্থ হই। আমরা আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনের জন্য কাঙ্ক্ষিত চাওয়াগুলোকে পাওয়ায় রূপান্তরিত করতে পারিনা। ফলে জীবন নিয়ে আমরা নিদারুণ হতাশায় ভোগী। নিরাশ হই এবং একাকীত্ব অনুভূব করি। আর এতে করে আমাদের জীবন হয়ে ওঠে এক বিভীষিকাময় তপ্ত মরুভূমির মত। যেখানে কোন সজীবতা নেই, নেই কোন স্বাচ্ছন্দ্য। এমন জীবনে মানুষ সফল হওয়া তো দূরের কথা বরং নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
অধিকাংশ মানুষ তার জীবন নিয়ে ততটা চিন্তিত নয় যতটা সে অন্যদের নিয়ে চিন্তিত। কখনও কখনও মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে তার নিজেকে উজার করে দেয়। ফলে সে তার অপর প্রান্তের কোন মানুষের কাছ থেকে বিন্দুমাত্র আঘাত পেতে চায় না। কিন্তু স্বার্থের প্রয়োজনে মানুষ মানুষকে আঘাত করে। যা তার প্রত্যাশার বাইরে থাকে। মানুষের মধ্যে আবেগ আছে, অনুভূতি আছে, প্রেম আছে, বিরহ আছে। আছে স্বপ্ন কিংবা সাধনা করার প্রবল ইচ্ছে। যা একজন মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই সবকিছুই শেষ হয়ে যায় যখন তার জীবনের সব স্বপ্নগুলো কোন না কোন ভাবে অন্য মানুষের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী স্বপ্ন দেখে বা একটি বিষয় নিয়ে কল্পনা করে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মানুষ তার দেখা স্বপ্নগুলোকে বাস্তব করতে সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে।
কোন কোন মানুষ মনের দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। আবার কেউ কেউ মনের দিক থেকে অনেক বেশি দূর্বল। যিনি মনের দিক থেকে অনেক বেশি দূর্বল তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। শুধু তাই নয় এমন দূর্বল চিত্তের মানুষগুলো অপর প্রান্তের মানুষের দেওয়া অল্প আঘাতেই দুমড়ে মুচড়ে যায়। কখনও কখনও এই আঘাত মানুষকে বেচে থাকার স্বপ্নকে মেরে ফেলে। ফলে মানুষ তার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জীবন নিয়ে পালাতে চায়। তখন সে তার অজান্তেই ভুল পথে পা বাড়ায়। এমনকি সে প্রচন্ড হতাশায় ভোগে যা তাকে আত্মহত্যার মত মহাপাপের মত পথ বেছে নিতেও প্ররোচিত করতে পারে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আত্মহত্যাকে একটি মহাপাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেভাবেই সে আত্মহত্যা করুক না কেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: «وَلَا تَقْتُلُوْا أَنْفُسَكُمْ، إِنَّ اللهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا»
‘‘এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু’’। (নিসা’ : ২৯)
জুন্দাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
كَانَ بِرَجُلٍ جِرَاحٌ فَقَتَلَ نَفْسَهُ، فَقَالَ اللهُ: بَدَرَنِيْ عَبْدِيْ بِنَفْسِهِ، حَرَّمْتُ عَلَيْهِ الْـجَنَّةَ.
‘‘জনৈক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে সে তার ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বললেন: আমার বান্দাহ্ স্বীয় জান কবযের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করেছে অতএব আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম’’। (বুখারী ১৩৬৪)
সাবিত্ বিন্ যাহ্হাক (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ فِيْ الدُّنْيَا عَذَّبَهُ اللهُ بِهِ فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ.
‘‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন বস্ত্ত দিয়ে আত্মহত্যা করলো আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে সে বস্ত্ত দিয়েই শাস্তি দিবেন’’।
মানুষ হিসেবে আমরা যতটা না কঠিন তার চেয়েও অনেক বেশি কোমল। তাই আমাদের নিজেদের কে সবসময় শক্তিশালী মানুষীকতার অধিকারী হয়ে উঠতে হবে। এই শক্তি সেই শক্তি, যা মানুষকে প্রবল ঝড়ের মধ্যেও বিন্দুমাত্র বিচলিত করবে না। বরং সে সবকিছু সহ্য করেও মানুষিক দিক থেকে হবে অনেক উন্নত, অনন্য ও প্রাণবন্ত। বর্তমানে আমাদের দেশের তরুণ তরুণীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে প্রায়ই পত্র পত্রিকার পাতায় এসব ঘটনাগুলো সচারাচার আমরা দেখতে পাই। যা খুবই দুঃখজনক একটি বিষয়। একজন তরুণ কিংবা তরুণী কেবলমাত্র একটি পরিবারের সম্পদ নয়। বরং সে এ সমাজের ও দেশের সম্পদ।
আমাদের দেশের তরুণ তরুণীদের মধ্যে এসব অনাকাঙ্খিত আত্মহত্যা প্রবণতাকে ঠেকাতে তাদের মানষিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। সেক্ষেত্রে তরুণ তরুণীদেরও এগিয়ে আসতে হবে উন্নয়নমূলক নানা সামাজিক কর্মকান্ডে। বিশেষ করে নিরাপদ রক্তদান কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করা, জনউন্নয়ন মূলক কাজে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা, মানবিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করা, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে এগিয়ে আসা, ধর্মীয় চর্চা বৃদ্ধিতে নিজেকে প্রস্তুত করা, দুর্যোগকালীন সময়ে দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাড়ানো। কেবলমাত্র মানুষ নামের মানুষ নয় বরং একজন সত্যিকারের মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিজের ক্যারিয়ার কে উন্নত করতে পরিশ্রমী হতে হবে।
শুধু তাই নয় নিজেকে বিনয়ী, ভদ্র ও মার্জিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে চারপাশের সবাই তাকে সম্মান করবে, শ্রদ্ধা করবে এবং ভালোবাসবে। এমন কোন কাজের সাথে জড়িত হওয়া যাবে না যা সমাজের জন্য, দেশের জন্য অথবা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। তাই জীবনে নিজেকে অনন্য একজন মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে অবশ্যই প্রতিটি কাজের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নিজেকে ধরে রাখতে। যাই ঘটুক না কেন হতাশ হলে চলবে না। বরং সকল হতাশা কে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। জীবন কে উন্নত করতে কারও প্রতি কোন প্রত্যাশা রাখা যাবে না। বরং নিজেকেই প্রত্যাশার জায়গায় তৈরি করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
কি পেলেন কি হারালেন সে বিষয়ে অজথা মাথা ঘামিয়ে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করা যাবে না। সবসময় মনে রাখতে হবে যা আপনার ছিল না তা আপনি পান নি। আর যা আপনার জন্য বরাদ্দ ছিল সেটা আপনি পেয়েছেন। সুখ কিংবা দুঃখ জীবনের অংশ। কোন কিছু পেয়ে খুব বেশি আনন্দিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই, আবার কোন কিছু হারিয়ে খুব বেশি হতাশ বা নিরাশ হওয়ারও দরকার নেই। কেননা সবকিছুতে নিজেকে ধরে রাখাই হচ্ছে আসল উদ্দেশ্য। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বর্ণিত আছে, ‘আপনার জন্য যা নির্ধারণ করা হয়েছে তা যদি দুই পর্বতের নিচেও থাকে, তবুও তা আপনার কাছে পৌছে যাবে। আর যা আপনার জন্য নির্ধারণ করা হয়নি, তা যদি আপনার দুই ঠোঁটের মাঝেও থাকে তবুও তা আপনার কাছে পৌঁছাবেনা।’
এমন নয় যে, আপনি বা আমি কিছু একটা পেলাম যেটা আমার জীবনের জন্য অনেক দামী। তার মানে এই নয় যে, আমি বা আপনি জীবনের সবকিছু পেয়ে গেলাম। অনুরূপভাবে জীবন থেকে কোন কিছু হারিয়ে গেলেও আমরা এমনভাবে হতাশ বা নিরাশ হব না। জীবন থেকে কিছু হারালাম তার মানে এই নয় যে, আমরা আমাদের জীবন থেকে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। এমন কিছু ভাবলে চলবে না যে, এই হারানোর জন্য আমরা শেষ হয়ে গেছি। যার কারণে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলি। বরং নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে তৈরি করতে হবে। যাতে করে নিজের ভুলগুলোকে শুধরে নেওয়া যায়। জীবনে জয় পরাজয় থাকবে। এটাকে মেনে নিয়েই জীবন পথ চলতে হবে।
হতাশা মানুষের জীবনের সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন ইচ্ছেগুলোকে মেরে ফেলে। তাই হতাশা থেকে বাঁচতে নিজেকে নতুন করে সাজাতে হবে। সবসময় মনে রাখতে হবে, আজ যা পাইনি কাল হয়তো এর চেয়েও ভালো কিছু পাবো। আজ পারাজিত হয়েছি তাতে কি? আগামীকাল জয়ী হবো এই মানষিকতা থাকতে হবে। কেউ আমাকে ভেতর থেকে ভেঙ্গে দিতে চাইলে আমি কেন নিজেকে ভেঙ্গে দেব। কেউ কষ্ট দিলে সে কষ্টকে কেন আমি আমার জীবনের বড় বোঝা মনে করবো? কেন আমরা সবসময় নিজে সুখে থাকার কথা ভাববো? আমাদের পরিবার আছে সমাজ আছে, সমাজে অবহেলিত অসংখ্য মানুষ আছে। তাদের কথা ভাবতে হবে। একজন মানুষ হিসেবে আপনার যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।
আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। বরং এটি জীবনের চরম নিশ্চিত পতন। যা আপনাকে চরমভাবে কুলশিত করবে। সমস্যা থাকবে এগুলো নিয়েই আপনাকে আগামীর সুন্দর জীবন উপভোগ করতে হবে। নিজের মেধা ও প্রজ্ঞা কে কাজে লাগাতে পারলে জীবন কে অনেক সুন্দর করা যায়। মনে রাখবেন জীবন থেকে পালিয়ে কখনও বাঁচা যায় না। আত্মহত্যা কোনভাবেই আপনার সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সমাধান হচ্ছে সেখানে যেখানে আপনি পহাড় সমান কস্ট নিয়েও সোজা হয়ে দাড়িয়ে তার মোকাবেলা করে নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবেন। তাই জীবনে যাই ঘটুক না কেন আপনাকে সফলতার পথে হাটতে হবে। যেখানে জীবনের শেষ সেখান থেকেই জীবনের শুরু। আপনি যদি একবার জীবনে সফল হতে পারেন তবে জীবনের সব দুঃখ, কষ্টকে পিছনে ফেলে অনন্য এক জীবন যাত্রার যাত্রী হয়ে দুঃখের লাগাম টানতে পারবেন।
তাই আসুন কারও প্রতি প্রত্যাশা নয় বরং নিজের জীবনকে ভালোবাসি, নিজেকে ভালোবাসি। জীবন হেরে যাওয়ার জন্য নয় বরং জয়ী হওয়ার জন্য। আর জয়ী হওয়ার জন্য আমাদের অসংখ্য বার হেরে যেতে হয়। তাই এই হারকে জীবনের শেষ অধ্যায় না ভেবে বরং সফলতার দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। হারতে হারতেই মানুষ একসময় জয়ী হয়। তাইতো শ্রদ্ধেয় কবি রবিন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। আপনার জীবন হোক অন্যন্য সুন্দর।
লেখক: মোঃ রিসালাত মীরবহর
সম্পাদক, অবেলার ডাক সবার জন্য সাহিত্য
বরিশাল, বাংলাদেশ।

আসুন সুস্থ্য ধারার সাহিত্য চর্চায় সবার সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেই [Click]
Writer & Editor: Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com,
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]
E-mail: obalardak@gmail.com,
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]


