অজপাড়া গাঁয়ের জুয়াইরিয়া দুরন্ত কিশোর বয়স পেরিয়ে নবযৌবনপ্রাপ্ত হয়েছে মাত্র। কিশোর বয়স অন্যদের মতো তার ছুটাছুটি,অন্যের আম গাছে আম ছিঁড়ে,মানুষের ফসল নষ্ট করে, ছোট ছোট অন্যায় কিংবা সবুজ মাঠের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটাছুটি করে কাটিয়ে দিতে পারেনি। পারেনি কিশোর বয়সের আনন্দ উপভোগের মাধ্যমে তার সজিবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে। কিশোর বয়সে দুষ্টামি একটু একটু অন্যায় নতুনদের পথে চলার অভিজ্ঞতা অর্জন সবকিছুই যেনো কিশোর বয়সের সজিবতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু জুয়াইরিয়ার জীবন অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। আমি যখন নিজেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটিয়েছি তখন দেখেছি ছেলেটি একাকী কোন গাছের নীচে নয়তো পুকুর পাড়ে একটু ছায়া দেখে বসে কি জেনো ভাবনায় ডুবে থাকে।
আমরা তরুনরা যখন মাঠে ক্রিকেট ব্যাট-বলের আঘাতের সাথে আমাদের আনন্দময় চিৎকারে আলোড়িত করেছি মাঠ ঘাট তখন দেখেছি তার ভাবনার উপর ভর করে আকাশের কালো মেঘে ছেয়ে যেতে,তার লুকিয়ে কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে আমাদের আনন্দ গুলোকে ধুয়েমুছে নিয়ে যেতে। কালো মেঘ আর প্রচন্ড ঝড় যেনো জুয়াইরিয়ার পক্ষ নিয়ে আমাদের আহ্বান করেছে আমাদের ভাবুক হতে, আমাদেরও এই আনন্দ উল্লাসের সাথে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব নিয়ে ভাবতে। আসলেই আমাদেরও ভাবা উচিত ছিলো প্রাচীনযুগ পেরিয়ে এসে আধুনিকযুগে, পরাধীনতার শিকল জীবন আর তাজা রক্ত দিয়ে ছিন্ন করে স্বাধীনতার মাঝেও গোলামীর ভাব দুর করতে আমাদেরও কাজ করা এবং সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে ভাবা উচিত ছিলো। ভাবতে আমরা ব্যার্থ হয়েছি বলেই তার মতো সাহসী হতে পারিনি তবে একটা বিষয় ভালোই হয়েছে, তার মতো হয়রানীর স্বীকার হতে হয় নি, হতে হয় নি কারো শত্রু।কখনো অন্যায় করেও আমাদের দুর্নাম হয় নি কিন্তু সে অন্যায় না করেও, সর্বদা জনকল্যাণমুখী কাজের আনজাম দিয়ে সামনে থাকা জুয়াইরিয়ার বদনামে ছেয়ে থাকতো পুরো গ্রাম এবং আশাপাশেও। কারন সে ভাবুক ছিলো, ছিলো সাহসী।
অন্যায়কে অন্যায় বলে ঘোষণা করতে দ্বিধা করতো না। উচ্চ পদমর্যাদার মানুষ রুপে পশুর অন্যায় দেখে ভীতু না হয়ে জাগ্রত কন্ঠে জাতিকে,সমাজের মানুষকে জাগ্রত করার চেষ্টা করার কারনেই সে ছিল অপরাধী।তবে সে বরাবর আমাদের চেয়ে ভালো করতো। পড়াশুনায় তার আশেপাশেও থাকতে পারতাম না আমরা।তার সফলতার ছিল যেনো আকাশচুম্বী।তার বদনাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও সবাই তার ভালো গুন গুলো জানতো তার নামে প্রশাংসা করতো লুকিয়ে লুকিয়ে, এমনকি আমি অনেককে বলতে শুনেছি যারা তার চরম শত্রুর মতো প্রকাশ্যে বদনাম রটাতো সেও বলতো আমার ছেলেটা কিংবা আমার নাতি যদি জুয়াইরিয়ার মতো হতো তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।তবে জুয়াইরিয়া ছেলেটি শান্তি পায় নি কখনো। সে সত্য পথের পথিক হিসাবে দাবি করতো না তবে তাকে সবাই সেই উপাধিতে ভূষিত করেছিল যদিও উপাধি তা তার সাথেই মানায়। তার পরিবার থেকে অনেক চাপ আসতো, তার বাবা মা তাকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তার চলার পথ পরিবর্তন করে অন্য দশটা ছেলের মতো হয়ে যেতে।অন্যায় অবিচার দেখে চুপ থাকতে।
কিন্তু সে কখনো এসব কথায় কিংবা তার বিপদের কথা ভেবে নিজের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারেনি। একটা বিষয় আমাকে খুব ভাবাতো যখন আমরা অনার্সে ভর্তি হয় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকতার ছড়াছড়ি দেখতে পাই।আমরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পরি কিন্তু সে সে-সবে জড়ায় নি। আমি ভেবেছিলাম সে নেতার মতো কাজ করে তার চিন্তা ভাবনা সুদৃঢ় প্রসারি, সে যদি নেতা হতে চাইতো অনেক বড় নেতা হতে পারতো। কিন্তু সে একাকী জনকল্যাণমুখী কাজ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করে চলতো।আর এটাই ছিল তার চরম পরিণতির মুল কারন। আমরা পড়াশুনার নামে বাহিরে গিয়ে আড্ডা দিয়ে আসতাম, আর সে একটি ছোট দোকানে চাকরি করে নিজের খরচ চালাতো। শুনেছিলাম ১৫শ টাকার বেতনে কঠোর পরিশ্রম করতো সে। সে যতোদিনে পুলিশের উচ্চ পদে চাকরি না পেয়েছিল ততদিনে সে এভাবে চলতো,তার বাবা মা তাকে বাঁধা দিলে কবিদের মতো বলতো-
আমায় কেনো বাঁধা দাও মা
আমি এখন ছোট্ট নয়,
সঠিক পথে চলবো আমি
দুর করব সামাজিক অন্যায়।
মাগো বলো সাহস হয় না প্রতিবাদের
চুপ থাকতে সকল অন্যায়ে,
আমিও যদি অন্যায়ের শিকার হয়
পাপ নিয়ে কি মরবো না তাতে?
এসব শুনে তার মা বলতো বড় প্রতিবাদী হয়ে গেছিস বড় কবি হয়ে গেছিস তাই না, তোর কিছু হলে আমাদের কি হবে। তখন সে জবাবে বলতো বিষাদ হৃদয়ের মালিক কিংবা প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়ের প্রশান্তি রুপে কবির কলমে নিঃসৃত শব্দ ও শব্দ গুচ্ছই কবিতা।মিথ্যার মাঝে সত্যকে বলিষ্ঠ কন্ঠে মধুর সুরে উপস্থাপন করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো কবিতা।আমি কবি হতে চাই না, আমি কবির কলমে সত্য হয়ে ফুটতে চাই। আমি যে সত্যর জন্য লড়াই করি, আমার কিছু হলে সেই সত্যই তোমাদের দেখে রাখবে। এসব শুনে তার মা আর কিছু বলতে পারতো না। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে অনার্স শেষ করেই পুলিশের বড় পদে চাকরি পেয়ে গেলো। অতীতেও সে কোন দলে যুক্ত হয়নি, চাকরী জীবনে এসে দেখে অন্যায়ের ভরপুর এখানেও একাকী কাজ করা শুরু করলো। তার কাজ করা থানের পাশে একটা মরা নদী অবস্থিত,সে নদীর ধারে চলতো নানা অন্যায় অপকর্ম।
কোন পুলিশ কোন একশন নিতো না কারন তারা থানায় বসে সরকারের টাকার মতো মাসের শেষে পারিশ্রমিক পেয়ে যেতো অন্যায়কারীদের কাছে থেকে। আমি একটা চাকরির ভাইভা দিতে তার থানার কাছেই গিয়ে উঠলে তার সাথে যোগাযোগ করি, ছোট থেকে যদিও তার সাথে আমাদের মিশতে দেওয়া হতো না তবুও কেন জানি তার প্রতি আমার একটা আবেগ ভালোবাসা কাজ করতো।তাকে লুকিয়ে অনুসরণ করা ছিল আমার একটা ভালোলাগা এবং নিয়মিত কাজ।আমি তার সাথে দেখা করতে চাইলে সে অনেক খুশি হয়ে আসে,আমাকে বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়ায় এবং বাসায় নিয়ে আশ্রয় দেয়। আমি জানতাম না তার সাথে জীবনের এই প্রথম এবং শেষ খুশির মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ পেয়েছি। বুঝতেও পারিনি একজন সত্য ন্যায়বান আদর্শ দেশপ্রেমিকের সাথে একটা রাতের কিছু অংশ সুন্দর ভাবে কাটিয়ে ভোর বেলায় তার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদবো।
আমার সাথে গ্রাম সমাজ সহ সকল খবর নিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘুমাতে যাওয়া পুলিশ সৈনিক মাঝ রাতে অপারশনে বের হয়েছে আমাকে না জানিয়েই, তেমনি তার দলের কিছু সৈনিক তাকে না জানিয়েই তাকে মারার ফাঁদ তৈরি করেছিল। যাদের অন্যায় পথের প্রধান বাঁধা হয়ে থাকতো এই জুয়াইরিয়া। তবে তার মৃত্যুতে তো সকলের খুশি হওয়ার কথা ছিল, মিষ্টি বিলানোর কথা ছিল কিন্তু তা হয় নি, আমি দেখেছি তার বাবা মার চেয়ে তার শত্রু যারা ছিলো তারা বেশি কান্না করেছে। তাদের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে সেই অতীতে লুকিয়ে লুকিয়ে উচ্চারিত শব্দ গুলো। জুয়াইরিয়া খুব ভালো ছেলে ছিল, আজ আমরা ভালো, সচেতন দেশপ্রেমিক ছেলে হারালাম।
এসব কথা আমার ছেলে মেয়েকে বলতে বলতে চোখ মুছে নিলাম। কারন আজ তার তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকি। আমাকে সে রাতে বলেছিল আবিদ নিরাশ হয়ে হারিয়ে যাওয়া সহজ, সমুদ্রের স্রোতের পক্ষে থেকে ভাসিয়ে যাওয়া সহজ তবে তা কিছুক্ষণ পর বিলিন হয়ে যায় কিন্তু যে বিপরীতে চলে তার কষ্ট হলেও যাত্রা হয় সুদূর প্রসারিত পথে। সেই হয় সফল। তুমি তোমার ছেলে কে ভালো ভাবে মানুষ করিও। আর হ্যাঁ আমি আমার ছেলে কে জুয়াইরিয়ার মতো মানসিকতা দিয়েই বড় করতে প্রতিজ্ঞা করেছি এবং করছি কারন এমন ছেলে প্রতিটি ঘরে ঘরে দরকার।
লেখক: মোঃ জান্নাতুন নাঈম
বাংলাদেশ।


