বিজ্ঞাপন: ০১

Type Here to Get Search Results !

বিজ্ঞপ্তি:

Notice: To read this website in your country's language, please change the language. Contact us for advertising: +8801516332727 (What's App) Thank you

বিজ্ঞাপন: ০২

দুই পৃথিবী

মানুষের জীবনে যদি কোন আকাঙ্খিত চাহিদা অপ্রত্যাশিত ভাবে হারিয়ে যায়, তখন হৃদয়ে সে ব্যথাটা এমনভাবে আঘাত করে যা সহ্য করা অসহনীয় হয়ে পড়ে। এমনিই এক পরিস্থিতে একান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধুর মাঝে অঘটন ঘটে যাওয়ার ফলে দুই বন্ধু নাসের এবং মুরাদের বন্ধুত্বের ফাটল চরম আকার ধারণ করেI কাহিনীটির ইতিবৃত্ত খোলসা করেই বলা যাক।

বসন্তকাল, কিন্তু অসহ্য গরম আবহাওয়া বইছে I সবারই ধারণা পৃথিবীটা বদলে গেছে, তাই তো ঋতুর এ রকম পরিবর্তন। এরই মধ্যে জানালার কাছে দু’টি কাক কর্কশ স্বরে কা-কা আওয়াজ তুলে নাসেরের কান ঝালা-পালা করে তুলছে। নাসের ভাবছে কাকের এই অসহনীয় আওয়াজ আগামীতে কোন বিপদ আপদের আগাম শঙ্কা দিয়ে যাচ্ছে কিনা। এই পৃথিবীতে নাসের একা, সাত পাঁচে কেউ বেঁচে নেই। তাই বন্ধু মুরাদই তার সব। আজ বিকালে নাসের তার প্রানপ্রিয় বন্ধু মুরাদকে নিয়ে পাত্রী দেখতে যাবে। এরই মধ্যে নাসেরের কয়েকটি পাত্রী দেখা হয়ে গেছে। তবে নাসেরের মনোপূতঃ হয়নি। সময় সময় সে ভাবে ‘দূর ছাই ! বিয়েই করবোনা’। আবার এও ভাবে যদি কখনো কোথায় ও কোনো মেয়েকে ভাল লেগে যায়, তাহলে তাকে সরাসারি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দিবে। মেয়ে রাজী হলে হবে না হলে না হবে, শুধু শুধু পাত্রী দেখার অজুহাতে কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মা কে মানসিক কষ্ট বা অপদস্ত করতে তার মন সায় দেয়না। মাঝে মাঝে সে নিজেকে অপরাধী মনে করে। এবার মনে মনে পণ করে নিল, ‘এবারই পাত্রী দেখা শেষ দেখা, আর কোন কিন্তু নয়।

ছোট বেলায় থেকেই নাসেরর কষ্টের জীবন। আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য লেখাপড়া বেশিদূর এগুতে পারে নাই। যদিও সে ছাত্র হিসাবে ভালোই ছিল। কোনোমতে বি.এ পাশ করে তাদেরই গ্রাম থেকে কিছু দূরে এক মফস্বল শহরে একটা হাই স্কুলে মাস্টারী করে। এদিকে প্রিয় বন্ধু মুরাদ অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। এম.এ পাশ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (Education Cadare) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ওই একই শহরে এক সরকারী কলেজের অধ্যাপক। লেখাপড়ায় এবং আর্থিক দিক থাকে দুই বন্ধুর মধ্যে তফাৎ থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের বন্ধুত্বটা অটুট রয়েছে। তাই আজও বন্ধু মুরাদকে সাথে নিয়ে তার পাত্রী দেখতে নিয়ে গেল। সময় মত পাত্রীর বাসায় পোঁছালো। পাত্র্রীও দেখা হল। সৌভাগ্যক্রমে এ যাত্রায় নাসেরের পাত্রী পছন্দ হয়ে গেল। নাসের পাত্রীর পক্ষের লোকদেরকে তার পছন্দের কথা প্রকাশ করে বললো, ‘আমাদের পাত্রী পছন্দ হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত প্রস্তাব নিয়ে দিনক্ষণ ধার্য্য করে যাব।

পাত্রী দেখার সপ্তাহখানিক পর নাসের পাত্রীদের বাসায় যেয়ে পাত্রীর বাবা-মা কে সুখবর দিয়ে বিয়ের সমস্ত আয়োজন করার জন্য অনুরোধ জানাল। নাসেরকে হতবাক করে পাত্রীর বাবা যা বললেন তা শুনে নাসির মানসিক ভাবে এমন হোঁচট খেল যা কল্পনাতীত। পাত্রীর বাবা জানালেন, ‘আমাদের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এবং পাত্র আপনারই বন্ধু মুরাদের সঙ্গে। আপনার প্রস্তাব দেয়ার আগেই মুরাদ আমাদের বাসায় এসে আমাদের মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে গেছে। আমরাও তার প্রস্তাব পূর্ণ মর্যাদার সাথে গ্রহণ করেছি।’ একটু বিরতী নিয়ে বললেন, ‘বলুন, কোন বাবা-মা চায় এমন সুযোগ্য পাত্রকে হাতছাড়া করতে? এ প্রস্তাব না গ্রহণ করলে আমাদের বোকামী ছাড়া আর কি হতো ! নিশ্চয়ই আমাদের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছেন।’


পাত্রীর বাবার কাছ থেকে কথাগুলি শুনে নাসের এতটাই ক্ষুব্ধ এবং দুঃখ পেলো যে, সে সোজা মুরাদের বাসায় চলে আসলো। মুরাদ বাসাতেই ছিল। নাসের মুরাদের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ‘এ কি শুনলাম মুরাদ, তুমি নাকি সেই পাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এসেছো যাকে নাকি আমি আমার বিয়ের প্রস্তাব দিতে চেয়ে ছিলাম, কথাটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে এ কেমন বন্ধুত্ব? তুমি তো তাহলে আমার ভারা ভাতে ছাই দিয়ে দিলে। চতুর মুরাদ এরকম কিছু ঘটবে জেনে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। সে ধীর মস্তিষ্কে বলল, ‘শান্ত হও নাসের, এ পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা উপর ওয়ালার ইচ্ছায় হয়ে থাকে। মানে আমি বলতে চাইছি, যে মেয়েটিকে আমরা দেখে এসেছি, সে মেয়েটির বিয়ে আমার ভাগ্যে লেখা ছিল এবং সেটাই হতে যাচ্ছে। শুধু শুধু তুমি আমার উপর রাগ করছো। কার ভাগ্যে কি লেখা থাকে আমরা সাধারণ মানুষেরা তা জানি না। বরং তুমি নিজেকে সংযত কর। মুরাদের এসব কথা শেষ না হতেই নাসের ঝাঁঝালো সুরে বললো, ‘এই মুহূর্তে তোমাকে আমার বন্ধু বলতে ঘৃণা হচ্ছে। তুমি একটা স্বার্থবাদী, লোভী, অমানুষ। তুমি আমার সাথে যে বেইমানী করলে তার জন্য আমি তোমাকে কোন অভিশাপ দেব না অথবা কারো কাছে তোমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও করবোনা। শুধু তোমার কথার প্রতিধ্বনি করে এইটুকু বলতে চাই যে, এই পৃথিবীতে একজন উপরওয়ালা আছেন এবং তিনিই এর বিচার করবেন। কতগুলি একটানে বলে নাসের গট গট করে মুরাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।

নাসেরের মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। সে দু’চোখে যেন অন্ধকার দেখছে। বেদনার সাথে অন্ধকারের কোথায় যেন মিল আছে। সে ভেবে চলছে তার জীবনটা কেন এমন হলো। বাস্তব বুঝি এমনই হয়। আসলে আমরা যদি এই পৃথিবীর চারিদিকে লক্ষ্য করে দেখি তাহলে দেখতে পাই যুগ যুগ ধরে নানাভাৱে, নানাস্তরে, নানাছলে পৃথিবীটা একটা আশাহীন বিশৃঙ্খলতায় পরিনিত হয়েছে। নাসেরের বেলায়ও তাই হলো। মনের দুঃখে নাসের তার জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে অন্য এক শহরের স্কুলের চাকরি নিয়ে চলে গেল। সে স্কুলেরই এক সহকর্মীকে বিয়ে করে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো সংসার জীবন শুরু করলো।

সময় কারো সাথে ছলনা করেনা। নীরবে সে নদীর জলের মত বয়ে যায়। কার জীবনে কি ঘটলো তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নাই। যথা সময়ে মুরাদের তিনটি সন্তান জন্মালো। প্রথমে দু’টি মেয়ে এবং পরে ছেলেটি। এদিকে নাসেরের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। প্রকৃত সংসারী হিসাবে নাসের এবং তার স্ত্রী তাদের দুই সন্তানকে বেশ ভালো ভাবেই মানুষ করেছে। মেয়েটি মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করে একটা বেসরকারী কলেজে লেকচারার আর ছেলেটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে পুলিশ সার্ভিসে নিয়োগ পেয়েছে। বর্তমানে সে নারায়ণগঞ্জ শহরের বড়কর্তা। নাসেরের ছেলে বাবার মতই ভদ্র, অমায়িক এবং সৎ প্রকৃতি হয়েছে। পুলিশের বড় কর্তা হয়েও ঘুষ এবং নানা কুকাজ থেকে নিজেকে সংযত রেখেছে। একদিন বিশ্বস্তসূত্রে তার অফিসে খবর এলো যে, তাদের শহর থেকে একটু দূরে এক ভন্ড পীর সাহেব নিজেকে ধর্মীয় পন্ডিত দাবী করে কয়েক হাজার লোককে তার শিষ্য বানিয়ে সেখানে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

ভক্তরা পীর সাহেবকে অন্ধের মত ভক্তি করে এবং বিশ্বাস করে তাদের পীর সাহেব স্বর্গীয় আদর্শে দীক্ষিত হয়ে নানারকম অদভুত কান্ড অলৌকিক ভাবে ঘটাতে পারে। তাছাড়া সে গুজব ছড়িয়ে বলে বেড়ায় সে সর্বশক্তিমান বিধাতার কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জীবনের যে কোন জটিলতা থেকে তাদেরকে মুক্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখে। পরে এও জানা গেল পীর সাহেব তার আশ্রমে ভক্তদের বিশেষ করে মেয়েদের সাথে নানা ছল-চাতুরী বিস্তার করে তাদেরকে অনুচিত কাজে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। পীর সাহেবের আশ্রমের অপরাধজনিত খবরাখবর আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠলো যখন চারজন নারী থানায় গিয়ে এই মর্মে অভিযোগ করলো যে, ওই পাষণ্ড এবং পৈচাশিক পীর তাদেরকে মাসের পর মাস নানাছলে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তুলে। অন্য এক নারী অভিযোগ করে বলে যে, নানা প্রলোভন দেখিয়ে ওই ভন্ড তাকে ফাদে ফেলার চেষ্টা করেছে।

এ সমস্ত নানা অভিযোগ শোনার পর একদিন সেই তথাকথিত পীরকে বন্দি করে থানায় নিয়ে আসা হলো। ঘটনাচক্রে জানা গেল ওই আসামী পীর মুরাদের ছেলে। ছেলের এই সমস্ত অপকর্ম সম্পর্কে মুরাদ আগেই ওয়াকিবহাল ছিল। তাকে অনেক বুঝিয়ে ছিল। এ সমস্ত কুকাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছিল অনেকবার। কিন্তু তার কথা গ্রাহ্য করে নাই। তবুও মুরাদ ছেলের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে থানায় হাজির হল। হাজার হোক ছেলে তো বটে। তার এই দুর্দিনে পাশে এসে দাঁড়ালো।

থানায় যেয়ে মুরাদ জানতে পারলো, থানার বড় কর্তা তার এক কালের বন্ধু নাসেরের ছেলে। তাই মনে অনেক ভরসা হলো। নানা জায়গায় অনুসন্ধান করার পর নাসেরের খোঁজ পাওয়া গেল। মুরাদ ছেলেকে হাজত থেকে মুক্ত করার জন্য নাসেরের সাহায্য চাইলো। নাসের ভদ্র কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বললো, ‘এখানে আমার ছেলের করণীয় কিছুই নেই, ওটা এখন কোর্ট কাচারীর ব্যাপার।’ তারপর একটু কৃত্রিম হেসে জানালো, ‘তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, তুমি আমাকে একদিন বলেছিলো, ‘এ পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা সৃষ্টিকর্তার নির্দেশই ঘটে’, তোমার ছেলের জীবনে যা কিছু ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে সেটাকে তোমার মেনে নেয়াটাকেই আমি শ্রেয় মনে করি। আর হ্যা, কখনও তোমার ছেলের সুপারিশের জন্য আমার কাছে আসবেনা, কথাটি যেন ভালো করে মনে থাকে। মুরাদ যে ভরসায় নাসেরের কাছে এসেছিলো তা এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সেই সাথে মনে পড়লো, একদিন নাসেরকে সে এমনি করেই আঘাত দিয়েছিলো আজ তার উচিত জবাব পেয়ে গেল।

লেখক: কামাল কাদের
ইলফোর্ড, ইংল্যান্ড।

বিজ্ঞাপন: ০৩ [Top]

বিজ্ঞাপন: ০৪ [Below]

বিজ্ঞাপন: ০৫

বিজ্ঞাপন: ০৬