
মোঃ রিসালাত মীরবহর।। আমরা প্রায়ই তর্কে লিপ্ত হই, মানুষ খাওয়ার জন্য বাঁচে নাকি বাঁচার জন্য খাবার খায়? এ বিষয়ে অনেক যুক্তি তর্ক থাকতেই পারে। সেটা মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মতামতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নিজস্ব ভাবনা। সে যাই হোক কিন্তু একটি জায়গায় অন্তত সবাই আমরা একমত আর সেটা হচ্ছে নিরাপদ খাদ্য। আমরা খাওয়ার জন্য বাঁচি কিংবা বেঁচে থাকার জন্য খাই, আপনি যাই বলেন না কেন আমাদের সবথেকে বেশি জরুরী হচ্ছে নিরাপদ খাদ্য। যা আমাদের শরীর ও মনকে অনেক সতেজ ও সুস্থ রাখতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা সেই নিরাপদ স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে আজ অনেকটাই বঞ্চিত। যা আমাদের কে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। আসুন আমরা জেনে নেই নিরাপদ খাবার কি এবং আমাদের জীবনে নিরাপদ খাবার কেন এত জরুরী।
সুস্থ জীবনের প্রথম শর্ত হচ্ছে নিরাপদ খাবার। কেননা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরী। প্রতিদিন আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তা শুধু ক্ষুধা নিবারণ করে না বরং এটি আমাদের শরীরের শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে আমাদের বেশ সহায়তা করে। কিন্তু সেই খাবার যদি অনিরাপদ হয়, তাহলে প্রয়োজন মেটানোর পরিবর্তে তা হয়ে উঠতে পারে অসুস্থতা ও নানা জটিল রোগের কারণ। তাই নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
নিরাপদ খাবার বলতে এমন খাদ্যকে বোঝায়, যা উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রস্তুত ও পরিবেশনের প্রতিটি ধাপে জীবাণু, ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভেজাল ও অন্যান্য দূষণ থেকে মুক্ত থাকে। খাদ্যে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ কিংবা অতিরিক্ত রং ও সংরক্ষণকারী উপাদান মিশে গেলে তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। অপরিষ্কার খাদ্য সামগ্রী, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন ভাবে খাবার তৈরি, অহেতুক খাবারে বিভিন্ন রাসায়নিক ক্যামিকেল ব্যবহার এবং দীর্ঘদিন ধরে ভুলভাবে খাবার সংরক্ষণ করাও আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।
তাই আমরা যদি অনিরাপদ খাবার খাই তবে আমাদের শরীরে তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যেমন: ডায়রিয়া, বমি, গ্যাস্ট্রিক, পেট ব্যাথা সহ নানা ধরনের পেটের পীড়া বা অসুখের সংক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ভেজাল ও দূষিত খাবার গ্রহণ করার ফলে লিভার, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক ও দূষিত পদার্থ দীর্ঘমেয়াদে আরও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।
নিরাপদ খাবারের বিষয়টি কেবলমাত্র ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং এটি একটি পরিবার ও পুরো সমাজে বসবাসকারী মানুষের সুস্থতার বিষয়ের সঙ্গেও জড়িত। যেমন ধরুন পরিবারের একজন সদস্য অনিরাপদ খাবার গ্রহণের কারণে অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার পেছনে অর্থ ব্যয় হয়। এছাড়া তার অসুস্থতার কারণে সে কর্মহীন হয়ে পড়ে কিংবা তার কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে পরিবারের ওপর একধরনের বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। একইভাবে একটি সমাজে খাদ্যজনিত রোগ বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন কেবলমাত্র সময়ের দাবী নয় বরং এটি অর্থনৈতিক ভাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
কিন্তু কিছু কিছু কারণে খাদ্য নিরাপদ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে নামে বে নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের ফলে প্রতিনীয়ত মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুকিতে ফেলছে। গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাঙ্গের ছাতার মত ছোট বড় দোকানগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন খাবার খেয়ে থাকে। বিশেষ করে রুটি, বিস্কুট সহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার খায়। এদের মধ্যে শ্রমজীবি মানুষের একটি বিরাট অংশ রয়েছে। রয়েছে প্রান্তিক মানুষও। এসব খাবার কখনও কখনও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে থাকে। ফলে সাময়িক ক্ষুধা নিরবারণের জন্য মানুষ এসব খাবার খেয়ে থাকে। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায় এসব খাবার খেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ মারত্মক অসুস্থতা জনিত কারণে ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে।
এছাড়া বেশি মুনফার আশায় নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করছে অনেকেই। ফলে এসব খাবার খেয়ে অনেকের বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে শরীরে। যা আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। খাদ্য নিরাপদ রাখতে ভোক্তা হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। খাবার কেনার সময় অবশ্যই পণ্যের মান, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যাচাই করে কেনা উচিত। ফলমূল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। খাবার যথাযথ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। রান্নার আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা, নিরাপদ পানি ব্যবহার করা এবং অপরিচ্ছন্ন ও অপরিস্কার পরিবেশে তৈরি খাবার অবশ্যই এড়িয়ে চলা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া খাদ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদেরও নৈতিক ভাবে গড়ে উঠতে হবে। অধিক মুনাফার আশায় খাদ্যে ভেজাল মেশানো বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা থেকে অবশই বিরত থাকতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা, বাজার তদারকি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সবচেয়ে ভালো হয় দেশের সকল খাদ্য পরিবেশনকারী দোকানীদের একটি কোডের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা। যাতে করে একটি সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে কেউ ভেজাল খাদ্যের ছবিসহ খুব সহজেই অভিযোগ জানাতে পারে। অর্থাৎ ভোক্তা সহজেই ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযোগ জানাতে পারে। ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় খাবার পরিবেশনকারী সকল প্রতিষ্ঠানকে কিউআর কোডের আওতায় আনা এবং সেই কোড প্রতিষ্ঠানে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। যাতে ভেজাল খাদ্য পরিবেশকের বিষয়ে যথাযথ কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
আমাদের সবার মনে রাখতে হবে, নিরাপদ খাবার মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। আমরা প্রতিদিন কী খাচ্ছি, তার ওপর নির্ভর করে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য। তাই খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো, খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রিতে সততা নিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরের জনগনের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আর তাই বাহিরের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে যতটা সম্ভব। প্রয়োজনে ঘরে খাবার প্রস্তুতের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
সুস্থ মানুষই একটি সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। তাই নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। আজকের একটু সচেতনতা আগামী দিনের অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। তাই আসুন সবাই মিলে নিরাপদ খাবার এর গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বিষয়ে কার্যকর বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করি। যাতে করে মানুষ খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখি। আসুন দেশকে ভালোবাসি। দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি নিরাপদ বিশ্ব উপহারে কাজ করে যাই। সবশেস স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। তাই খাদ্যে ভেজাল পরিবেশন না করে বরং নিরাপদ খাদ্য পরিবেশে আন্তরিক ও নৈতিক হয়ে উঠি।
সম্পাদক, অবেলার ডাক
বরিশাল, বাংলাদেশ।
বরিশাল, বাংলাদেশ।

