নাবিল গ্রামের ছেলে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়ার পরই সে বুঝে ফেলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জীবনের আসল খেলার মাঠ। এই মাঠেই খেলতে হবে জীবনের সেরা খেলাটা। জীবনের টার্ণিং পয়েন্টা কাজে লাগাতে হবে। ক্লাস, পড়াশোনা, পরীক্ষা এসব গৌণ। আসল বিষয় হলো ভাইরাল হওয়া। ভাইরাল হলেই নেতা। নেতা হলেই গাড়ি-বাড়ি, আর গাড়ি-বাড়ি মানেই সুখের সাগরে লাফিয়ে সাঁতার কাটা। নাবিলের মতে, সংসদ সদস্য হওয়া তেমন কঠিন কিছুই না। আগে একটা তুলকালাম কান্ড ঘটাতে হবে, তারপর নিজের ভাগ্য যেভাবে চালাবে, সে শুধু সেভাবেই হাঁটবে।
কিন্তু কোন কান্ড ঘটাবে? এটাই তো বুঝতে পারছিল না নাবিল। দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস চষে বেড়ায়, কোথাও কোন ঝগড়া বা কোথাও কোন ধাক্কাধাক্কি, কোথাও কোন সুযোগসন্ধানী বিতর্ক হচ্ছে কিনা খুঁজে বেড়াতে লাগল। নাবিল মনে মনে ভাবছে, একবার সুযোগ পাইলে হইল, এমন কাণ্ড ঘটামু যে নিজেরেও চিনতে পারব না। এভাবেই ভাইরাল হওয়ার তীব্র শখে একদিন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে সিংহগর্জন অনুশীলন করছিল, আমি জনগণের নেতা। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। পাশ দিয়ে যাওয়া দু-একজন হাসলেও নাবিল থামে না। নায়কেরা কখন ইতিহাস রচনার আগে লজ্জা পায় নাকি? নাবিল ও পায় নায়।
সেদিন বিকেলবেলা হঠাৎ ক্যাম্পাসের পাশেই ছোটখাটো জটলা। দূর থেকে দেখে মনে হলো পুলিশ একজন বেখেয়ালি ছেলেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে সকলের চোখ শুধু দৃশ্যটার দিকেই, কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না। নাবিলের চোখ চকচক করে উঠল, এইটাই টাইম। আজ আমার ভাইরাল হওয়ার দিন। সে দৌড়ে গিয়ে পুলিশের কলার ধরল। এই তোরা আমাদের চাকর-সেবক, বুঝছিস? আমাদের খাইবি, আমাদের পড়বি, আবার আমাদেরই ধরবি? ছাড় আমার বন্ধুকে।
পুলিশ প্রথমে ভেবেছিল নাবিল হয়তো সেই ছেলের আত্মীয়। তাই ধৈর্য ধরছিল। কিন্তু নাবিল থামার ছেলে না। ভিড় দেখে তার সাহস দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। মনে মনে ভাবল, আজ যাই হোক, লাস্ট পারফর্ম্যান্সটা করেই ছাড়বো। ঠিক তখনই বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্যামেরারা একে একে এসে দাঁড়াল। নাবিলের বুকটা আরও ফুলে উঠল। এরা কুকুরের দল, নাবিল নাটকীয় ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠল, আমাদেরই খাবে, আমাদেরই পড়বে আর আমাদের ছেলেপেলেকে ধরে নিয়ে যাবে? আমার শরীরে প্রাণ থাকতে আমি তা হতে দিব না। এই বলে সে পুলিশের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কিন্তু এরপর যা হলো, তা তার কল্পনার চেয়েও দ্রুত। দুটো পুলিশ হাত-পা চেপে ধরল, আরেকজন চেঁচিয়ে বলল, এই ছেলে যে সন্ত্রাসীটারে আমরা ধরছি, তার সাথী মনে হয়। একেই আগে নিয়া চলো। নাবিলের নায়কোচিত মুখটা মুহূর্তেই পেঁচার ছানার মতো হয়ে গেল। আরে না না। আমি সন্ত্রাসী নই। আমি নেতা হতে চাই। আমি প্রতিবাদের মানুষ। কিন্তু তখন আর কেউ শুনছে না। তার উপর চড়াও হলো সাংবাদিকদের ঝাঁক, কেন পুলিশের উপর হামলা করলেন? আপনি কি ওই সন্ত্রাসী দলের সদস্য? এটা কি রাজনৈতিক শোডাউনের অংশ? নাবিল বলতে চাইল, না, ওসব কিচ্ছু না। আমি প্রতিবাদ করতে এসেছি। কিন্তু মুখ খুললেই পুলিশ চুপ বলেই আচ্ছা একটা ধমক দেয়।
অবশেষে পুলিশ তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে থানায় নিয়ে গেল। গাড়ির ভিতরে বসে সে আশায় ছিল যে, কোনো সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বড় ভাই, কিংবা মিডিয়ার কেউ এসে তাকে নায়ক ঘোষণা করবে। কিন্তু কেউ এল না। থানায় নিয়ে যেতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলো। প্রশ্নের উত্তর না মিলতেই শুরু হলো হালকা-গরম পিটুনি। বল ওই সন্ত্রাসীর সাথে তোর সম্পর্ক কি? স্যার, আমার কোন সম্পর্ক নাই। আমি প্রতিবাদ করতে গেছিলাম। মানে আমি প্রতিবাদী নাগরিক। এক চড়েই নাবিলের বাকিটুকু বাক্য গিলে গেল। ওদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ভিডিও আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, দেখুন, যুবকের সাহস, পুলিশের উপর হামলা করা নতুন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার।
সবাই নিজের মতো করে ক্যাপশন দিচ্ছে। নাবিলের স্বপ্ন সত্যি হলো। সে ভাইরাল হয়েছে।তবে সেটি তার কল্পনার মতো নেতা-হওয়ার ভাইরাল না বরং দাঙ্গাবাজ ভাইরাল। থানার লকআপে বসে চুপচাপ দেয়ালে তাকিয়ে থাকে নাবিল। পাশে থাকা বৃদ্ধ ভিখারি জিজ্ঞেস করে, কিরে কি অপরাধ করছস? নাবিল কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ভাই, আমি ভুল করে ভাইরাল হইয়া গেছি।
লেখক: সাঈদুর রহমান লিটন
ফরিদপুর, বাংলাদেশ।

