ঢাকার এক কোণে, এক মধ্যবিত্ত এপার্টমেন্টে থাকেন শাকিল ভূঁইয়া। বয়স পঞ্চান্ন হলেও তাঁর মুখে বয়সের ছাপ তেমন নেই। বাইরে থেকে তিনি রাগী আর কঠিন মানুষ বলে মনে হয়| নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, প্রতিবেশীরা দূরত্ব বজায় রাখে। অথচ ভেতরে ভেতরে তিনি একেবারেই অন্য মানুষ, খুব কোমল ও খুব সহানুভূতিশীল। যেন নারকেল। বাহিরটা শক্ত, ভেতরে মিষ্টি পানি আর নরম শাঁস।
এপার্টমেন্টের পাশে কয়েকটি পরিত্যক্ত জমি, উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল তুলে তালাবদ্ধ রাখা। মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকায় জায়গাগুলো ফাঁকাই পড়ে থাকে, যেন ছোট ছোট জেলখানা। সেসব জায়গায় মাঝেমধ্যেই বিপদে পড়ে কিছু কুকুর। খাবারের খোঁজে বা কৌতূহল বশে দেয়াল টপকে নামলেও আবার বেরোতে পারে না। উঁচু দেয়ালে আটকে দিন পার হয় তাদের।
তখন শুরু হয় কান্না। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। অসহায় হয়ে চিৎকার করে যায় কুকুরগুলো। অনেক সময় সেখানেই মারা যায়। একদিন শাকিল সাহেব নিজ চোখে দেখেছিলেন, বড়ই গাছের নিচে পড়ে আছে শুকনো কঙ্কাল মৃত কুকুর। সেই দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন ৯৯৯ বা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেবেন। পরে মনে হলো রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য কল পেয়ে ওরা হয়তো বিব্রত হবে। অবশেষে নিজেই এই দায়িত্ব নিলেন।
শাকিল সাহেবের পরিচিত এক রিকশাওয়ালা ছিল ভোলার ছেলে দুলাল। সেও একদিন কুকুরের কান্না শুনে তাঁকে জানায়। দু’জনে মিলে ঘুরপথে ঢুকে কুকুর উদ্ধার করেন। কিন্তু কাজটা সহজ ছিল না। আশেপাশের অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। কেউ বিদ্রুপ করেছে, কেউ আবার হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। একটা কুকুরের জন্য এত ঝামেলা? তবু তিনি থেমে যাননি।
একদিন পাশে থাকা রিকশাগ্যারেজ থেকে এগিয়ে আসে রফিক। রংপুরের ছেলে, ঢাকায় রিকশা চালায়। সে প্রাণীপ্রিয় একজন মানুষ। বিড়াল, টিয়া, কুকুর সবই পোষে। শোনামাত্রই সে সাহায্যের প্রস্তাব দিল। রফিক আর তার এক সহযোগীকে নিয়ে শাকিল সাহেব কয়েকটি কুকুর উদ্ধার করেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কিছু বকশিশ দিলেন। এরপর থেকে রফিক হয়ে উঠল তাঁর নির্ভরযোগ্য সহচর। মোবাইলে রফিকের দুই নম্বর তিনি সেভ করলেন ‘Dog Rescue 1’ আর ‘Dog Rescue 2’ নামে।
এভাবেই শুরু হলো নিয়মিত অভিযান। ভোরে বা গভীর রাতে কোনো কুকুরের আর্তনাদ শোনা গেলেই শাকিল সাহেব প্রথমে টের পান। জানালা খুললেই বোঝা যায়। সঙ্গে সঙ্গে ফোন যায় রফিকের কাছে। সে সহযোগী নিয়ে আসে, মই বা দড়ি ফেলে কুকুর উদ্ধার করে।
এই কাজের খরচ বহন করেন শাকিল সাহেবই। মোবাইল রিচার্জ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, কখনও কিছু নগদ টাকাও। ধীরে ধীরে এটি তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়। কত প্রাণ বেঁচে গেছে, তার হিসাব আর রাখা যায়নি। ছোট কুকুরছানা থেকে শুরু করে বড় রাস্তার কুকুর সবাই তাঁর মানবিকতায় জীবন ফিরে পেয়েছে। যারা প্রথমে বিদ্রুপ করেছিল, তারাই একসময় সম্মান করতে শুরু করল। কারণ এমন দয়া ও দায়িত্ববোধ সবাই দেখাতে পারে না।
শাকিল ভূঁইয়ার মনে হয়, মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে এক বিশেষ অনুভূতি দিয়েছেন। যেখানে অন্যেরা শুধু বিরক্তির শব্দ শুনে পাশ কাটায়, সেখানে তিনি শুনতে পান এক নিরীহ প্রাণের বাঁচার আকুতি। তাঁর বিশ্বাস এই অসহায় প্রাণগুলোকে উদ্ধারের ফলে সেও হয়তো অনেক অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন।
আজও চলছে সেই নীরব, অক্লান্ত উদ্যোগ। একজন মানুষ, এক রিকশাওয়ালা আর কিছু কুকুরের মধ্যে এক অনন্য বন্ধনের গল্প হয়ে।
লেখক: ইকবাল খান
ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ
বিজিবি সদর দপ্তর, পিলখানা, ঢাকা, বাংলাদেশ।
Writer & Editor: Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com,
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]
E-mail: obalardak@gmail.com,
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]


