মোঃ রিসালাত মীরবহর।। বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। এ যুগে আপনি বা আমি কেউই প্রযুক্তি ছাড়া থাকতে পারছি না। বিশেষ করে নিত্য দিনের বিভিন্ন জরুরী গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমরা কোন না কোন ভাবে প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি। আমাদের প্রতিদিনের নানা কাজে আমরা আসলে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে যাচ্ছি। যা আমাদের নিত্য দিনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আমরা মুঠো ফোনের মাধ্যমে সকল প্রয়োজনীয় কাজ সহজেই সম্পাদন করতে পারছি। ফলে নিঃস্বন্দেহে এটি আধুনিক যুগে আমাদের জন্য দ্রুততম যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাই এ কথা অস্বীকার কারার কোন উপায় নেই যে, বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় মুঠো ফোন ব্যতীত চলা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। মুঠো ফোনের এই গুরুত্ব যেমন একটি দিকে মানুষের কাজের গতি বাড়িয়েছে তেমনি অন্যদিকে বাড়িয়েছে ব্যপক হতাশা। আজ আমরা জানবো তথ্য প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় প্রযুক্তির আঘাতে কিভাবে কোমলমতী অবুঝ শিশুরা বাকশক্তি হারাচ্ছে।
আমরা অনেকেই রয়েছি যারা সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর কাছে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা মুঠোফোনে ফেসবুক, ইউটিউব সহ অন্যান্য সোস্যাল প্লাটফর্মগুলোতে বিচরণ করে থাকি। এছাড়া মুঠোফোনে কল আসলে তা রিসিভ করে অপর প্রান্তের মানুষটির সাথে অনরগল কথা বলতে থাকি। বিশেষ করে ইমো, হোয়াটস্এ্যাপ, টেলিগ্রাম সহ অন্যান্য ভিডিও এ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে যাই। ফলে কৌতুহল বশত একটি কোমলমতী শিশু তার অযাচিত মনে বিষয়টিকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে চিন্তা করতেই পারে। মুঠো ফোনে যখন কল আসে কিংবা ইউটিউবের কোন কনটেন্টের শব্দ যখন তার ইন্দ্রিয় শক্তির কাছাকাছি পৌছায় তখন তার ব্রেইন অনেকটা মনযোগী হয়ে ওঠে বিষয়টিকে বোঝার জন্য। এটাকে আমরা শিশুর প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের প্রাইমারী স্টেটেজ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করে থাকি তা হচ্ছে মুঠো ফোন দেখিয়ে শিশুকে খাবারের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। কারণ শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে অধিকাংশ শিশুর খাবারের প্রতি বেশ অনীহা দেখা দেয়। অবুঝ শিশুর খাবারের প্রতি সেই অনীহাকে আগ্রহে পরিণত করতে আমরা একপ্রকার বাধ্য হই শিশুকে ইউটিউবে থাকা কার্টুন ভিডিও ছেড়ে দিতে। তাহলে যা দাড়ায় যে খাবার সহজে শিশুর খাওয়ার কথা ছিল না এখন ভিডিও দেখে সে খাবার শিশু অবলিলায় খেয়ে নিচ্ছে। আর যদি শিশু খাবার খেতে না চায় তবে আমরা তাকে আর ভিডিও প্লে করে দেখাচ্ছি না। ফলে দুটি জিনিস এখানে ঘটছে এক প্রযুক্তির প্রতি শিশুর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। যা একধরনের আসক্তি তৈরি করছে। আর দুই শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে প্রযুক্তি তার চোখে পৌছে দিচ্ছি। আর এটাই হচ্ছে শিশুর প্রতি প্রযুক্তির আঘাত।
কথা বলছিলাম একজন মায়ের সাথে। ওনার নাম রাহেলা (ছদ্ম নাম)। প্রায়ই দেখতাম ওনার শিশু বাচ্চাটিকে নিয়ে হাটতে। বেশকিছু দিন ধরে আমি লক্ষ্য করলাম ওনার বাচ্চাটি অতিরিক্ত পরিমাণ দুষ্টামি করছে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন ভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে। কৌতুহল বসত একদিন ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম আপা আপনার ছেলে এত দুষ্টামি করে আপনি বিরক্ত হন না? আমাকে উনি জানাল ভাই দুষ্টামি করে তাতে আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্তু ও তো কথা বলতে পারে না। ও যদি একটু কথা বলতে পারতো তাহলে হয়তো আমার কিছুটা শান্তি লাগত। এবার আমি কিছুটা নড়েচরে বসলাম।
এবার বিষয়টি সম্পর্কে আমার আরও কৌতৈুহল বেড়ে গেল। এবার আমাকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নিতে হবে। বাচ্চাটি কেন কথা বলছে না আবার কেনইবা এত বেশি দুষ্টামি করে। রাহেলা আপাকে এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম আপা ওর সমস্যা আসলে কি? এবার আপা উত্তর দিল, ভাই ও কিছু সমস্যায় ভুগছে। আমি বললাম, ডাক্তার দেখান নাই? বলল, দিখিয়েছি তবে চিকিৎসা চলামন রাখতে হবে বলে জানিয়েছে ডাক্তার। কি হয়েছে তা কি জেনেছেন? হ্যাঁ জেনেছি, ও অতিরিক্ত মোবাইল ভিডিও দেখতে দেখতে ও বাকশক্তি হারিয়েছে। বড় হয়েছে, স্বাভাবিক ভাবে হাটছে অথচ কথা বলতে পারছেনা, কিছুটা বোবা মানুষের মতো করে। ডাক্তার থেরাপী দিচ্ছে। আগে কিছুই বলতে পারতো না। তবে এখন বোবা মানুষের মতো আওয়াজ করতে পারে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম এমন কেন হলো বিস্তারিত ডাক্তার কিছু বলেছে। আপা জানালো, একেবারে ছোট বয়স থেকে মোবাইলে আসক্ত হওয়ার কারণে এমন হয়েছে। যখন ও শিশু বাচ্চা ছিল, যখন ও বিছানায় শুয়ে থাকত। মোবাইল ছাড়া কোন খাবার খেতে চাইতো না আর খাওয়াতেও পারতাম না। আর এই যে আপনার ছেলে অতিরিক্ত দুষ্টামি করে এটার কি কারণ। এটা সম্ভবত অতিরিক্ত কার্টুন দেখার ফলে এমন হয়েছে। কোন কারণ ছাড়াই ও একা একা বিভিন্ন ভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে। আবার কখনও কখনও নীরব হয়ে যায়। বিশেষ করে ওর আচারণগত সমস্যাই এখন বেশ প্রকট। সবশেষ আপা একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। এই দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে মিশে আছে হাজারো কষ্ট, আছে একমাত্র সন্তানের না বলা কথাগুলো শোনার দীর্ঘ অপেক্ষা। এই কষ্টগুলো একজন মায়ের জন্য অনেক হতাশার। কারণ প্রতিটি মা তার সন্তানের জন্য প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখে। আর এই স্বপ্নগুলো প্রতিদিন তাকে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।
পৃথিবীতে যত বেশি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে দিন দিন মানুষের বেঁচে থাকার সমস্যা তত বেশি বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন একদিকে যেমন আমাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যাপক গতি বাড়িয়েছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে দিন দিন আমাদের কোন না কোন ভাবে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। কখনও কখনও আমার কাছে মুঠোফোনকে আধুনিক চোরা বালির মতো মনে হয়। অর্থাৎ আমরা জেনেশুনে আমাদের ক্ষতি করছি অথচ এই ক্ষতিটি টের পাচ্ছি না। আমাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছি যারা অতিরিক্ত মোবাইল দেখায় আসক্ত। যা থেকে আমরা নিজেকে কোন ভাবেই বের করে আনতে পারছি না। মূলত মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের মানসিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত জীবনের নানা ক্ষতি হয়। এর মধ্যে রয়েছে চোখের ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি, ঘুমের ব্যাঘাত।
অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তির ফলে মানসিক চাপ ও একাকীত্ব, এবং সবশেষ মোবাইল বিকিরণের কারণে মস্তিষ্কে ক্যান্সারের ঝুঁকির প্রবণতা। এছাড়া, এটি সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাবকে প্রকট করে। এছাড়া মোবাইল থেকে নির্গত রেডিয়েশন মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে, যা স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এটি ক্যানসার, আলঝেইমার্স ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই আসুন আমরা ছোট ছোট বাচ্চাদের মোবাইলের পরিবর্তে শিক্ষণীয় বই পড়তে দেই। তাদেরকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে খেলাধুলা করতে মাঠে পাঠাই। মোবাইলের সকল প্রকাশ ব্যবহারকে তাদের জন্য সীমিত করে নিয়ে আসি। আমরা চাই একটি সন্তান সুন্দর হোক। একটি শিশু আগামী দিনের উজ্জল নক্ষত্র হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করুক। আর বয়ে নিয়ে আসুক সুনাম। এ পৃথিবী হয়ে উঠুক শিশুদের বাসযোগ্য। যেখানে শিশুরা মন খুলে হাসবে। তাদের মেধা দিয়ে জয় করতে আগামী দিনের ভবিষ্যত।

