
মোঃ রিসালাত মীরবহর।। নেদারল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশের একটি রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম অ্যামস্টারডাম। এই দেশ 'হল্যান্ড' নামেও পরিচিত। নেদারল্যান্ডসের প্রধান ধর্মগুলি হল খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম। মুসলিম আছে এক মিলিয়ন। বেশির ভাগ মুসলিম তুর্কি এবং মরক্কান। এছাড়াও ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, সোমালিয়া এবং সাবেক ডাচ কলোনী সুরিনাম থেকে আসা। দেশটির বড় শহর আমাসটারডাম, রটারডাম, হেগ এবং ইউট্রেক্টে বেশির ভাগ মুসলিম বাস করে।হল্যান্ডের মানুষরা পৃথিবীর মাথা পিছু সব চেয়ে বেশি সাইকেল ব্যবহার করে। ওখানে মানুষের চেয়ে সাইকেল এর সংখ্যা বেশি। সকল রাস্তায় গাড়ি পাশাপাশি সাইকেলের জন্যেও সাইকেল এর আলাদা জায়গা থাকে। এখানে রীতিমত সাইকেল এর জন্য জ্যাম হয়ে থাকে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পানির শহর কোনটি? উত্তর হল নেদারল্যান্ড এর আমস্টারডাম। এর চার ভাগের এক ভাগ নদী, নালা, খাল-বিলে ভরা। ক্যানাল বা নৌপথ এ শহরের সবচেয়ে বড়। আমস্টারডাম ১০০ কি.মি. এর বেশি ক্যানাল এবং ১ হাজার ৫০০ এর মতো ব্রিজ আছে। এত বেশি ক্যানাল ও ব্রিজের জন্য আমস্টারডামকে উত্তরের ভেনিস বলা হয়ে থাকে। নেদারল্যান্ডসের পূর্ব নাম হল্যান্ড, যদিও এটি নিউজিল্যান্ডের ঐতিহাসিক একটি অঙ্গরাজ্যের নাম। উত্তর আর পশ্চিমে উত্তর সাগর, পূর্বে জার্মানি এবং দক্ষিণে বেলজিয়াম অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে নেদারল্যান্ডস তার টিলা ও ডাইকের সুরক্ষা হারালে দেশটির অতি ঘনবসতি পূর্ণ অংশটির প্লাবিত হবার সম্ভাবনা আছে। দেশটির আয়তন ৪১ হাজার ৫৪৩ বর্গকিলোমিটার।

দেশটির আইনসভা দু’কক্ষ বিশিষ্ট। এটি বিশ্বের ৩য় প্রাচীনতম সংসদীয় সরকারব্যবস্থা। নেদারল্যান্ডসের রাজা রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে দ্বিকাক্ষিক আইনসভা, মন্ত্রীসভা ও সর্বোচ্চ আদালত অবস্থিত। নেদারল্যান্ডস ১২টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। এদেরকে প্রভিয়েন্স বলা হয়। এই প্রত্যেকটি প্রভিয়েন্স একজন গভর্নর দ্বারা শাসিত, যাকে কমিশনার অব দ্য কুইন বা কমিস্যারিস ভ্যান দ্য কোনিগিন বলা হয়। শুধুমাত্র লিমবার্গ প্রভিয়েন্সের প্রধানকে গভর্নর বলা হয়। নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতি একটি মিশ্র ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত। যা বাজার ব্যবস্থার অর্থনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যার বেশিরভাগ হালকা ও ভারি শিল্প এবং বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে গঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের পর কৃষি ও খাদ্য পণ্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ২য় অবস্থানে আছে নেদারল্যান্ডস।
দেশটির পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর জনসংখ্যার জীবনযাপনকে করেছে সমৃদ্ধশালী। রটারডাম বন্দরটি ইউরোপের মধ্যে যেমন বৃহত্তম বন্দর, তেমনি এশিয়ার বাহিরেও এটি বৃহত্তম। নেদারল্যান্ডসের মুদ্রার একক ইউরো। নেদারল্যান্ডস আজ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে একটি। দেশটির জনসংখ্যা এক কোটি ৭১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০। যদিও সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যা দ্রুত ‘ধূসর’ হচ্ছে, অর্থাৎ ৬৫ বছরের বেশি বয়সের উচ্চ শতাংশসহ, আমস্টারডাম আন্তর্জাতিক যুব সংস্কৃতির জীবন্ত কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটি হয়ে আছে। সেখানে, সম্ভবত দেশের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি, সামাজিক সহনশীলতার ডাচ ঐতিহ্য সহজেই সম্মুখীন হয়। পতিতাবৃত্তি, গাঁজা, স্বেচ্ছায় মৃত্যু, গর্ভপাত এবং ইথানেশিয়া সবই আইনি কিন্তু সাবধানতার সাথে নেদারল্যান্ডসে নিয়ন্ত্রিত।

নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোজোন, জি১০, ন্যাটো, ওইসিডি, এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাষ্ট্র গুলোর একটি। এছাড়া এটি শেনজেন এলাকা ও ত্রিপাক্ষিক বেনেলাক্স ইউনিয়নের অংশ। নেদারল্যান্ডসের সরকারি ভাষা হলো স্ট্যান্ডার্ড ডাচ। এই ভাষাটি সরকারি বিষয়াদি, মিডিয়া, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবহার হয়। এছাড়াও ডাচদের প্রায় ২৫টি উপভাষা আছে।ডাচদের দুগ্ধজাত খাবার প্রচন্ড পছন্দের। তাদের এই দুগ্ধজাত খাবার কতটা প্রিয় সেটা আলকমা ও ওয়েরডান শহরে গেলে বুঝতে পারবে যে কেউই। এছাড়া সামুদ্রিক খাবার, মাংসও তাদের প্রিয় খাবার।
ডাচ বাসিন্দারা সাধারণত প্রাতঃরাশ ও মধ্যাহ্নভোজনে টোস্ট, চা, মিষ্টি ও কফি খেয়ে থাকে। ডাচ সুশি হিসেবে পরিচিত, হেরিং ডাচদের অন্যতম প্রধান খাবার। এছাড়া নাস্তায় বিভিন্ন ঠান্ডা ও গরম স্যান্ডউইচ, ক্যানাপস ইত্যাদি তাদের প্রচলিত খাবার। ডাচরা খুবই মিষ্টান্নপ্রিয় জাতি। তাদের কিছু মিষ্টি জাতীয় খাবার খুবই লোভনীয় ও অদ্ভুত হয়ে থাকে। মোটাদাগে বলা যায়, ডাচদের খাদ্যাভ্যাস তেমন জটিল নয়। কিন্তু পুরোদস্তুর খাদ্যরসিক একটি জাতি হিসেবে, ডাচরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নেদারল্যান্ডসের রাজনৈতিক দিকের কথা যদি বলতেই হয়, তাহলে বলতে হবে, নেদারল্যান্ডসের রাজনীতি, ১৯৪৮ সাল থেকে দেশটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, এবং একটি বিকেন্দ্রীকৃত ঐক্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোতে পরিচালিত। নেদারল্যান্ড রাষ্ট্রের রাজধানী অ্যামস্টারডামের পাতাল ট্রেন ব্যবস্থার নাম আমস্টার্ডাম মেট্রো।
পৃথিবীর সবচাইতে ভদ্র পুলিশ মনে হয় নেদারল্যান্ডেসই আছে। পুলিশদের প্রতি কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। নেদারল্যান্ডসের অনেক জেলখানা প্রতিবছর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র কয়েদির অভাবে।

নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামের খাল এখন UNESCO World Heritage. আমস্টারডামে রয়েছে অনেকগুলো বিশ্বমানের মিউজিয়াম। এই দেশের ছেলে-মেয়ে গুলো সাইকেল চালায়। বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রারী। ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ অন্যতম দেশ হলো নেদারল্যান্ড। এখানে পড়তে যেতে হলে IELTS কমপক্ষে ৫.৫ বাধ্যতামূলক এবং আর্থিক সঙ্গতিরও ব্যাপার আছে।
নেদারল্যান্ডসের সাথে কয়েকটা ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে খুব মিল আছে। বাংলাদেশের মত নেদারল্যান্ডসও বন্যাপ্রবণ দেশ। এর কারন হল, নেদারল্যান্ডসের বেশির ভাগ অঞ্চলের অবস্থানই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে। এইজন্যই দেশটার নাম নেদারল্যান্ডস। অর্থাৎ Low Land বা নিচু জায়গা। নেদারল্যান্ডসের পানির পরিমাণ যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ, কোরিয়া আর তাইওয়ানের পরেই এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। পুরো শহরটাই যেন তরুণ-তরুণী আর যুবক-যুবতীতে ভরপুর। প্রাণ-প্রাচুর্যে টগবগ করে ফুটছে যেন পুরো শহর, সবাই অত্যন্ত সুন্দর ভাবে জীবনটাকে উপভোগ করছে।
তথ্য সংগ্রহে: