মোঃ রিসালাত মীরবহর।। মানুষ তার সারাজীবনে সুখ নামক মহা মূল্যবান বিষয়টি খুজে বেড়ায়। তবে কেউ খুজে পায় আবার কেউবা পায় না। ভাগ্য বড় সহায় আবার অসহায়। কার জীবনে কি আছে তা একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানেন না। কারণ একমাত্র তিনিই সকল ক্ষমতা ও পরিকল্পনার অধিকারী। তবে মানুষ সুখে থাকার জন্য জীবনে অনেক কিছু করে থাকে। সেই ছোট থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত সে সবকিছুর বিনিময়ে একটু সুখের খোজে দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায় তার কাঙ্খিত স্বপ্নের সেই সুখের খোজে। কিন্তু সুখের নাগাল পাওয়া বেশ কঠিন একটি বিষয়। যা চাইলেই পাওয়া যায় না। আমার জীবনে আমি অনেক মানুষ কে দেখেছি তার সবকিছু পরিপূর্ণ থাকতেও সে সুখে নেই। কিছু না কিছু সমস্যার কারণে সুখের যে কল্পনা তা মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে যায়। দিন যত যাচ্ছে মনে হচ্ছে তত সুখের নাগাল মানুষের চোখ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
কিছুদিন আগে একটি গ্রামে বেড়াতে গেলাম। খুব সুন্দর একটি সাজানো গোছানো গ্রাম। এর আগেও আমি বেশ কয়েকবার সে গ্রামে ঘুরতে গিয়েছি। বলতে গেলে আমার খুব পরিচিত একটি গ্রাম। মাঝে মাঝেই যেতে হয় সেই গ্রামে। ও আচ্ছা কেন যেতে হয় সেখানে? কারণ নারীর টানে। সে গ্রামের একটি মেয়েই আমার সাথে জুটি বেঁধেছে। যাকে নিয়ে আজ আমার পথ চলা। গ্রামটা বেশ ভালো লাগে। কেন ভালো লাগে? তার প্রথম কারণ হচ্ছে এই গ্রামের কোন জিনিস কেউ কাউকে না বলে ধরে না। আচ্ছা বুঝতে পারলেন না? বুঝিয়ে বলছি, সেখানে আপনি যদি কষ্ট করে কোন ফসল, ফল অন্যান্য সবজির চাষ করেন তবে কেউ তা কখনো না বলে নিবে না। কারণ সবাই যে যার অবস্থান থেকে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। সবার ফসল ফলন পর্যাপ্ত হয় বিধায় কেউ কারও কোন জিনিস না বলে ধরে না। অনেক জায়গায় আছে চুরি হয়ে যায় অনেক কিছু। কিন্তু এখনকার অবস্থা পুরোপুরি ভিন্ন।
আমি বেশ কয়েকটি ক্ষেত ঘুরে দেখলাম। মুগডাল, কলাই, মুসোরি, সূর্যমুখী বীজ, তিল ছাড়াও কলা, তরমুজ, আখ সহ নানা ধরনের কৃষিকাজ হয়। যে পরিবারটি আর্থিক দিক দিয়ে সবচেয়ে ভালো আছেন সেও কোন না কোন কৃষি কাজ করছেন। তাছাড়া গবাদি পশুর লালন পালন করছেন অনেকেই। স্থানীয় অনেক মানুষের সাথে কথা বলে জানলাম এখনকার মানুষগুলো কৃষিকাজকে বেশ পছন্দ করেন। যার বেশিরভাগই সখের বসে করেন। নিজেদের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি বাজারজাতও করে থাকেন। আমার কাছে এটিকে মনে হয়েছে কৃষি প্রধান গ্রাম। সবচেয়ে যে বিষয়টি লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে যে যাই চাষাবাদ করুক না কেন তা সুন্দর ভাবে ঘরে তুলতে পারছে।
ঐ গ্রামে বেড়াতে গেলে প্রাইয় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করি। একদিন আসরের নামাজ আদায় করতে গেলাম। দেখলাম একজন মুরব্বী বসে আছেন একা। বয়স আনুমানিক ৬০ এর বেশি হবে হয়তো। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি একজন মানুষ। আমাকে দেখেই তার কষ্টের কিছু কথা বলতে চাইলেন। প্রথমেই বললেন, বুড়ো মানুষের কোন মূল্য নেই। কথাটি শুনে আমি কিছুটা কৌতুহলী হয়ে উঠলাম। আমার বোঝার বাকি ছিল না যে তার মনে অনেক দুঃখ বাসা বেঁধে আছে। বিষয়টি পরিস্কার হতে জানতে চাইলাম কেন কি হয়েছে? তখন উনি উত্তরে জানালো, দেখেন যখন আমি চাকুরি করি তখন আমার পরিবার বিশেষ করে আমার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী আমার উপর খুব খুশী। আমি ছুটিতে বাড়িতে এলে তারা আমার জন্য অস্থির হয়ে যেত। আমি যখন অবসরে আসি তখনও তাদের কাছে আমি অনেক গুরুত্ব পেয়েছি। কিন্তু সেই গুরুত্ব আর বেশিদিন থাকলো না। দিন যত গড়ায় তত আমি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছি। আজ আমার টাকা নেই। আজ আমি আর কারও দায়িত্ব নিতে পারছিনা। কাউকে খুশি করতে পারছিনা। তাই আজ আপন মানুষগুলোও পর হয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় আমি সবার বোঝা হয়ে গেছি। অথচ একসময় আমি নিজের পরিশ্রমে সবার সুখের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি। আজ আমার পরন্ত বিকেল। এই বিকেলে মনে হচ্ছে আমি বড্ড একা। জীবনে এমন সময় দেখতে হবে তা আমার ভাবনায় ছিল না। ওনার কথা শেষ হলে আমি বললাম, মনে কষ্ট নিবেন না। যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছেন। আপনি মহান আল্লাহ কে ডাকুন নিশ্চয়ই তিনি আপনাকে সুখে রাখবেন। উনি বলে উঠলেন, মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানেন? দূরে কোথাও গিয়ে খরকুটো দিয়ে ঘর বানাই। হয়তো সেখানে সুখে থাকতে পারবো। আজ আমার কথার কোন মূল্য নেই। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী কেউই আজ আর আমার কথার বাধ্য নয়, তারা স্বাধীন। কিছু বলতে গেলেও শুনতে হয় অনেক কথা। মনে হচ্ছে আমি তাদের বিরক্তির কারণ। তাই দুঃখ হয় যাদের জন্য জীবনের অনেকটা সময় নিজের সব সুখ ত্যাগ করেছি তারাই আজ আমাকে বোঝা ভাবছে। তাদের কাছে আজ আমি এক গুরুত্বহীন মানুষে পরিণত হয়েছি।
আজ আর নিজের জন্য নিজের কাছে কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। নেই সেই আগের মতো করে কারও কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা। পরিবারের কেউ আর আগের মতো করে হাসি মুখে কথা বলে না। আমারও অনেক কথা থেকে যায় না বলা কথা হয়ে। সবকিছু থাকতেও দিনশেষে মনে হয় কিছুই নেই আমার। আমার কেবল আমিই আছি, এখন শুধু অপেক্ষা পালাবার। হয়তো কোন একসময় হারিয়ে যাবো কোন এক অজানাতে। যেখানে আমাকে আর কেউ বোঝা ভাবতে পারবে না। যেখানে আমার কথা শোনার মতো কেউ থাকবে না। সেদিন আর বেশি দূরে নয়। বার্ধ্যক্যের কোন একটি শেষ সময়ে ঘটবে সেই অন্তিম মুুহুর্ত। আমার আর কোন চাওয়া নেই, নেই কোন পাওয়া। এখন কেবল শুধু অপেক্ষা।
লোকটির সাথে কথা বলে মনে হয়েছে অনেকটা মনের কষ্টে কথাগুলো বলেছেন। জীবনের সব আয়োজন ছিল তার বৃথা। সবকিছু থাকতেও সে সুখের নাগাল পায়নি। তাইতো বৃদ্ধ বয়সে অন্তত খানিক সুখের আশায় নতুন করে একটু খানি কুড়েঘরে থাকতে চেয়েছেন। হয়তো সেই সুখটুকুই হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমাদের চারোপাশে এমন হাজারো বাবা-মা আছেন যারা বৃদ্ধ বয়সে মনের মধ্যে কষ্ট লালন করে সময়কে অতিবাহিত করছেন। হয়তো তাদের সে কষ্ট তারা কাউকে বলতে পারছেন না। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে তারা তাদের দুঃখ-কষ্টগুলোকে নিজ মনেই পুতে ফেলছেন। কাউকে বলার মতো তাদের কাছে কোন ভাষা নেই। হয়তো ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে আছেন পড়ন্ত বিকেলের সেই শেষ আলোর দিকে। যে আলো তাকে তার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দিবে।
আমরা যেন বৃদ্ধ বয়সের কারও মনে কষ্ট না দেই। তাদের মনের যত্ন নেই। তারা কষ্ট পায় এমন আচার ব্যবহার থেকে বিরত থাকি। তারাও একটু খানি সুখের আশায় থাকে। যে সুখ তাকে দূর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। হয়তো সে ডাকের সাড়া দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার থাকে না। হয়তো অনেক কষ্ট আর দুঃখ নিয়ে চির বিদায় নিতে হয় কোন এক সময়। আসুন আজ থেকে আমরা আমাদের চারপাশের বৃদ্ধ বয়সের সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলি। তাদের কে একটু আনন্দে রাখি। তারা হয়তো আমাদেরই বাবা-মা।