বিজ্ঞাপন: ০১

Type Here to Get Search Results !

বিজ্ঞপ্তি:

Notice: To read this website in your country's language, please change the language. Contact us for advertising: +8801516332727 (What's App) Thank you

বিজ্ঞাপন: ০২

নুরুর স্বপ্ন




















কার্তিক মাসের মঙ্গা এখনও উত্তরের দরিদ্র গ্রামগুলিতে যেন নীরব এক দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে। সেই দুর্ভিক্ষ বা মঙ্গার ধকল কাটাতেই পঁয়ষট্টি বছরের নুরু, দক্ষিণের জেলা লক্ষ্মীপুরে ধান কাটার দলে যোগ দিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল আরও কয়েকজন মফিজ, বাচ্চু, আর ১৮ বছরের এক তরতাজা যুবকরাকিবসহ মোট দশজন। গ্রাম থেকে বের হওয়ার সময় নুরুর স্ত্রী বলেছিল, ‘কি আর করেন, ছেলে মেয়েগুলোকে নিয়ে কতদিন কষ্ট-জ্বালা সহা যায়? এট্যা কাজ করে কিছু ট্যাকা ঘরেত আনেন। সেলা ঘরত আলে আবার মুখত হাসি ফুটবে।’

নুরু ও মনে মনে ভেবেছিল, ‘এবার একটু টাকা হবে। বেটি লাইলীর লাল জামা ও নাতিটার বহুদিনের শখ ক্রিকেট খেলার একটা ব্যাট এবার কিনে দেইম।’ শ্রমিক দলটি একটি পরিচিত মজুর ঠিকাদারের মাধ্যমে গিয়েছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা তপ্ত রোদ, কুয়াশার শীতল সকাল, ভিজে খড়, সব পরিবেশেই তারা কাজ করেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১২–১৪ দিন কাজ হলো।

একদিন রাতে শুয়ে রাকিব বলেছিল, ‘চাচা আপনার এট্টা বয়সেও এভাবে কাম দেখলে মোর লজ্জা লাগে। মোরা তো হাঁপাইয়া মরতাছি।’ নুরু চাচা ম্লান হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘বাপ, বাঁচতে হলে কষ্ট তো করবোই হয়। কষ্টে যদি মন টেকে, জীবনও টিকে।’ এবার রাকিব বলল, ‘আচ্ছা চাচা, তোমার বড় ছেলে মিজান যদি সংসার সামলাইতো তোমারে তো আর এই বয়সে কাজ করবা লাগতো না।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নুরু। ‘নারে বাপ ওরই তিনটা ছাওয়াল লইয়া ও নিজেই কুল পায় না। আমারে সামলাইবো কেমনে? যতদিন গা গতর চলে খেটেই খাইম। চোখ মুদলে সব ভাবনার শ্যাষ।’ কথা আর বাড়ায় না রাকিব, ক্লান্তি দুচোখে ভর করে। ‘ঘুমায়ে পড়, কাইল আবার সকালে উঠতে হবে’ একথা বলে রাকিব ও নুরু চাচা দুজনেই মাটির মতো শান্ত হয়ে মাটির বুকেই ঘুমিয়ে পড়ে, অস্থায়ী খড় বিছানো বাংলা বিছানায়।

এই কদিনেই দলটি যেন এক পরিবারের মতো হয়ে উঠেছিল। রাতে সবাই মিলে ভাত রান্না, সাথে ভর্তা তরকারি যেদিন যা জুটতো তাই খেয়ে নেওয়া। কাজ শেষে ক্ষুধার্ত পেটে যা মুখে দিত তাই অমৃতের মত লাগতো। খাওয়া শেষে সুখ-দুঃখের গল্প করায় একঘেয়েমি কাটতো সবার।

মজুর ঠিকাদার প্রতিদিনের হিসেবে হিসাব করে শেষ দিনে সবাইকে টাকা দিলেন। নুরু চাচার ভাগে ৬,৬০০ টাকা। তাঁর দীর্ঘ দিনের ঘাম, কষ্ট আর আশা একসাথে বাঁধা সেই ছোট কাপড়ের পুটলিতে। এবার বাড়ি ফেরার পালা। সন্তান, স্ত্রীর মুখগুলো ছবির মতো ভেসে উঠলো নুরুর চোখের সামনে। ফেরার সময় নুরু চাচা, রাকিব আর বাচ্চু একই বাসে উঠলেন। রাস্তায় ভিড়, ঠেলাঠেলি, মানুষের হুল্লোড় অজানা আতঙ্কে নুরু চাচা বারবার হাত দিয়ে পুটলিটা চেক করছিলেন।

রাকিব হেসে বলল, ‘চাচা, এত ভয় করো ক্যা? হামরা তো তুমার লগে লগেই আছি।’ নুরু চাচা বললেন, ‘বাবা, এ টাকাত মোর অনেক কিছু জড়ায়ে আছে রে, ছোট মেয়েটার লাল জামা, বেটা বউয়ের মাছ খাওয়া, ঘরের ভাঙা চৌকিটা ঠিক করা। মোর এলা তো কত কততো স্বপ্ন।’

রাকিব চুপ করে গেল। বাস থেকে লোকজন নামছে, উঠছে। ভিড়টা বেশি হওয়ায় বাচ্চুরা নামার সময় একটু আলাদা হয়ে যায়। নুরু চাচা নামতেই অনুভব করলেন, কোমরে হালকা একটা টান। তারপর ব্লেডে কাটা কাপড়ের টুকরো। তিনি থমকে গেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, পুটলি নেই। এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড… তারপর যেন সমগ্র পৃথিবী থেমে গেল। ‘হায় আল্লাহ্… মোর টাকা নাই…!’

কণ্ঠটা কেঁপে উঠলো। আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। রাকিব দৌড়ে এসে বলল, ‘চাচা কী হইচে?’ নুরু চাচা রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়লেন, ‘টাকালা… সব লে গেল!’ রাকিব হতবাক। বাচ্চুও এসে দাঁড়াল, কিন্তু তারা কেউ কিছু করতে পারল না। ভিড়ের মধ্যে পকেটমার কোন দিকে মিলিয়ে গেছে কেউ জানল না।

নুরু চাচার কাঁপতে থাকা ঠোঁট শুধু বলছিল, ‘বাপ-মাগো, ঘরেত যাই মুই কি কহিম’? মানুষজন দেখলো, কেউ কাছে এসে দাঁড়ালও, কিন্তু কেউ হাতে ধরে তুলল না। সাহায্যের হাত বাড়াল না।পৃথিবীর সব ভার যেন তার বুক চেপে ধরলো। তবুও নুরু নিজেই ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মাথা নিচু, চোখ ভেজা। যাবার সময় যেমন আশা নিয়ে গিয়েছিল, ফেরার সময় সেই আশার ভারই যেন পায়ে শিকল হয়ে গেঁথে গেল। বাড়ি পৌঁছা মাত্র ছোট্ট লাইলী দৌড়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরলো। 

‘আব্বা! তুই লাল জামা আনিছি?’ নুরু শুধু মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘কয়দিন কাজ করলেন? কয় ট্যাকা আনলেন?’ নুরু মাটির দিকে একবার তাকিয়ে দুই হাত মাথায় দিয়ে ধপ করে বসে পড়লো। শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বললো, ‘সব শ্যাষ বউ। মোর পকেট কাটি সব নিয়ে গেছে।’

স্ত্রী নির্বাক হয়ে রইলেন। অধিক শোকে যেমন পাথর হয় মানুষ, তেমন হলো তার। খানিক পর শুধু একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছন ফিরলেন তিনি। তারপর নুরুর বাহু দুটো ধরে বললো, ‘ওঠেন, কপালের লিখন খণ্ডাতে পারে, সাধ্য আছে কার? ট্যাকা গ্যাছে তাতে কি? আপনে তো আছেন। বাঁচে থাকলে টাকা কামাই হবে। সব স্বপ্ন পূরণ হবে। সবকিছুর মালিক আল্লাহ। লাইলীও বাপের সামনে এসে বলল, ‘আব্বা, তুই মন খারাপ করিস না। লাল জামা না পাইলে কি হইচে? মুই তোমাক পাইছু। মুই আর লাল জামা চাং না।’

কথা শুনে নুরুর চোখ আর একবার ভিজে উঠল। তিনি মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। দু’দিন পর সকালে হঠাৎ রাকিব এসে দাঁড়ালো, নুরু চাচার দোরগোড়ায়। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ। নুরু চাচা অবাক হয়ে বললেন, ‘এই রাকিব! তুই এইঠে ক্যান?’ রাকিব লজ্জায় মাথা চুলকাল। ‘চাচা, মোর আসলে কিছু ট্যাকা জমানো ছিল। আর কাজের দলে সবাই মিলে আরেকটু করে জোগাড় কইরছে। এগুলো তুমার তানে (জন্য)।’ ব্যাগ খুলে দেখা গেল তিন হাজার টাকা। পুরোটা দেওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু সবাই তাদের সাধ্য অনুযায়ী দিয়েছে। নুরু চাচা হতবাক, বাবা, এত কষ্ট করলু মোর জন্যি?’

রাকিব বলল, “চাচা, হামরা তুমার সব ট্যাকা ফেরত দিতে পারবো না। কিন্তু আপনি আবার কাজ করবেন, আবার আয় করবেন। শুধু ভাবিনু আপনি যেন আইজ অন্তত লাইলীকে হাসিমুখে একটা কিছু দিবা পারেন।’ লাইলী এগিয়ে এসে বলল, ‘আব্বা এই ট্যাকাত লাল জামা কিনুম?’ নাতি লালটুও এতক্ষণ ঘটনার বিহ্বলতায় থ মেরে সব দেখছিল। সেও এবার সাহস নিয়ে বলল, দাদু,মোর ব্যাটটা?’

নুরু দুজনকেই বুকে টেনে নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘না মা... এই ট্যাকাত আজ কিছুই কিনুম না। আগে ঘরত চাউল আনমু। যে দিন মোর নিজের কামাই করা ট্যাকা হবে, সেদিন লাল জামা আর ব্যাট দুইটাই কিনমু। মানষের দানে নয়, নিজের ঘামের দামে।’ লাইলী মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে আব্বা। মুই অপেক্ষা করিম।’ মেয়েটির স্নিগ্ধ হাসি দেখে বহুদিন পর নুরুর মুখে হাসি ফুটলো। তিনি বুঝলেন, হারা স্বপ্ন আবারও গড়া যায়, যদি পাশে দুএকজন মানবিক মানুষ থাকে। সেই লাল জামা আজও কেনা হলো না।

একদিন নিশ্চয়ই কেনা হবে লাল জামা। হয়তো দেরিতে, কিন্তু দানে নয়, নিজের উপার্জিত অর্থে। সেই সোনালী দিনের স্বপ্ন ভাসে নুরুর চোখে।

লেখক: মোঃ আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
সহঃ অধ্যাপক, মহাস্থান মাহীসওয়ার ডিগ্রি কলেজ
বগুড়া, বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন: ০৩ [Top]

বিজ্ঞাপন: ০৪ [Below]

বিজ্ঞাপন: ০৫

বিজ্ঞাপন: ০৬