মোঃ রিসালাত মীরবহর।। সেই ছোট বেলার কথা। সম্ভবত আমি ৩য় অথবা ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ি। ঠিক মনে নেই। ১৯৯৫ অথবা ১৯৯৬ সালের দিকের কথা। আমার বাবা ছিলেন পেশায় একজন ব্যবসায়ী। আমার ছয় বাপ চাচা। তাদের সময়ে তারা প্রত্যেকেই তখন শিক্ষিত। একই পরিবারের ছয়জন শিক্ষিত ছেলে খুব কমই ছিল তখন। বাবা বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করেন। তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তারী পড়বেন। কিন্তু সুযোগ পেলেন না। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবেন। কিন্তু তা যখন হতে পারলেন না তখন ব্যবসার পথটাকেই বেছে নিলেন। চাকরি করার সুযোগ ছিল। কিন্তু স্বাধীন ব্যবসাকেই তার কাছে অধিক প্রিয় মনে হল।
বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন ব্যবসা করতেন। ব্যবসার জন্য তিনি এক জেলা থেকে অন্য জেলাতে যেতেন। সেই রংপুর, দিনাজপুর, ভোলার প্রতন্ত অঞ্চলেও যেতেন। এভাবে বিভিন্ন ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে একটি ব্যবসাকে তিনি সময় দিলেন। সফল হওয়ার জন্য পরিশ্রম করতেন। হালাল রিজিকের জন্য তিনি দিনকে দিন আর রাতকে রাত মনে করতেন না।
একবার তিনি ঢাকায় রওনা দিবেন ব্যবসার কাজে। বাসায় বলে গেলেন ফিরতে দু’দিন লাগতে পারে। এর বেশি লাগবে না। তৃতীয় দিন বাড়িতে থাকবেন। ঢাকাতে গিয়ে চাচার মেসে উঠবেন। তখন অধিকাংশ সময় মানুষ লঞ্চে যাতায়াত করতো। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতো লঞ্চে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য নদী পথটাই ছিল বেশ নিরাপদ। আর আমাদের বাড়ি ছিল নদীর খুব কাছে। বাসার জানালা দিয়ে নদী দেখা যেত। আর বাবা ফেরার সময় লঞ্চে করে আমাদের সেই নদী দিয়েই আসতেন। তবে তখনকার দিনে তো যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিল না। চাইলেই কারও সাথে হুটহাট যোগাযোগ করা যেত না বা কারও খোজ খবর নেওয়া যেত না। কারণ তখনকার সময়ে মোবাইল ছিল না। তাই চাইলেই যোগাযোগ করা যেত না।
শীতের শেষ দিকে কোন এক বিকেলে বাবা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। মা তাকে বাড়ির দরজায় এগিয়ে দিয়ে আসলেন। সাথে ছিলাম আমি আর আমার ছোট বোন। বাবার সেই বিদায় ছিল আমাদের কাছে তার ফেরার আকুতী। বছরে দুই-তিন বার ব্যবসার কাজে বাবার এমন ঢাকায় যাত্রা করতে হয়। যেহেতু তৃতীয় দিন ফেরার কথা। তাই আমি আমার মা আর ছোট বোন নদীর পাড়ে গিয়ে দাড়ালাম। বাবা প্রতি বার ফেরার সময় লঞ্চের ছাদে গিয়ে তার হাত নাড়তেন। আর আমরা তখন নিশ্চিত হতাম বাবা আজ আসছেন। বাবা ফেরার সে কি আনন্দ। তার একটি পছন্দের শীত চাদর ছিল। চদরের রং ছিল ঘিয়া। আচল ছিল কালো ফুলের হাতের কাজ করা। এই শীত চাদরটায় বাবাকে খুব মানাতো। দেখতেও বেশ ভালো লাগতো।
মন ভিষণ খারাপ হয়ে গেল আমাদের সবার। একে একে ছোট বড় তিনটি লঞ্চ নদী পার হয়ে গেল। কিন্তু বাবাকে দেখতে পেলাম না। নদীর পাড় থেকে ফিরে এলাম। পরদিন আবার খুব সকালে অধীর আগ্রহে নদীর পাড়ে গেলাম। আজও বাবাকে দেখতে পেলাম না। এভাবে পঞ্চম দিন পাড় হয়ে গেল। কিন্তু বাবা ফিরে এলো না। এখন দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। মায়ের মুখখানা তখন মলিন হয়ে গেল। খোজ নিব তারও কোন উপায় নেই। প্রতিটি মুহুর্ত যেন বিষন্নতায় কাটছে সবার।
ষষ্ঠ দিনে আবারও গেলাম নদীর পাড়ে। খুব সকালে মনে অনেক আশা নিয়ে দাড়ালাম। আজ বাবা ফিরবেই। কিন্তু একে একে সব লঞ্চগুলো চলে গেল। বাবা ফিরলনা। এবার আর কান্না ধরে রাখতে পারলাম না। মা কাদছে আমিও কাদছি। বাবার কি কিছু হলো? এতদিন তো লাগার কথা না। সে তো বলে গেল তৃতীয় দিন ফিরবেন। বাবা ছিলেন এক কথার মানুষ। কখনও কথার হেরফের করেন না। জীবনে দেখেছি যদি কথা দিতেন কাউকে সেটা রাখতেন হাজার সমস্যা হলেও। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় ছয় দিন পাড় হয়ে গেল তবুও বাবা ফিরলেন না। এবার যেন চিন্তাটা দুঃশ্চিন্তায় রূপ নিল। মনের মধ্যে নানা বাজে চিন্তার দেখা দিল মায়ের। মা খুবই চুপচাপ হয়ে গেলেন।
সপ্তম দিন। ফরজের ঠিক কিছু পড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাড়ালাম। সূর্যটা তখনও ওঠেনি পূব আকাশে। মৃদু বাতাস বইছে। নির্মল সে বাতাস তখন কেবই জানান দেয় স্নীগ্ধ কোন এক প্রভাতের। যে প্রভাতে দাড়িয়ে আছি আমরা তিনজন মানুষ নদীর পাড়ে। হয়তো আজ বাবা ফিরবেন। ইতিমধ্যে একটি লঞ্চ পাড় হয়ে গেল। সে লঞ্চে বাবা নেই। বাবা থাকলে অবশ্যই হাত নাড়তো। মায়ের চোখে কেবলই দুঃশ্চিন্তার ছাপ। বাকি দু’টি লঞ্চ আসার অপেক্ষা। সূর্যটা তখন পূব আকাশে ডিমের কুসুমের মতো করে আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। পাখিরা যেন জেগে উঠেছে ঘুম ভাঙ্গা সকালে। চারদিক নীরব নিস্তব্ধ। দূর থেকে একটি লঞ্চ আসছে। হয়তো এই লঞ্চে বাবা ফিরছেন। কালো ধোয়ায় আচ্ছন্ন লঞ্চটির ছাদে কাউকেই দেখতে পেলাম না।
একবুক দুঃশ্চিন্তা আর হতাশা নিয়ে তখনও মা আমাদের দু’জনকে নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। এ যেন আপন মানুষ কে হারিয়ে ফেলার চিন্তায় নিমগ্ন এক সকাল। এখনও চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছি নদীর দিকে। যতদূর চোখ যায় ততদূর যেন খুজে বেড়াচ্ছি বাবাকে। মা তখনও দাড়িয়ে আছন আমার হাত ধরে। ছোট বোনটি তখন তার কোলে। নিরাশার মেঘ তখন আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাকি রইলো আর মাত্র একটি লঞ্চ। কিন্তু অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকেও সে লঞ্চ ফিরছে না। লঞ্চ আসতে এত দেরি হওয়ার কথা না। সাধারণত খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনটি লঞ্চ আমাদের নদী পাড় হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকে মা এবার হতাশা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। আমিও হাটতে শুরু করলাম। সম্ভবত আজ দু’টি লঞ্চ ফিরেছে। বাবা হয়তো আজও ফিরবেন না। মা আমার হাত ধরে হাটতে শুরু করলেন বাড়ির দিকে। এমন সময় দূর থেকে আরেকটি লঞ্চের শব্দ শুনতে পেলাম। কুয়াশার কারণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না লঞ্চটি। কেবল লঞ্চের পত পত শব্দ শুনতে পেলাম। একটু পড়েই লঞ্চের সামনা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। তখনও আমাদের চোখে ক্লান্তির ছাপ। বাবা ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে বিভিষিকাময়। কয়েকদিনের অনিদ্রা আর দুঃশ্চিন্তায় মা বড্ড ক্লান্ত।
মুহুর্তেই লঞ্চটি চোখের সামনে চলে এল। সামেনর অংশ পাড় হতেই অস্পষ্ট একটি মানুষ দেখতে পেলাম লঞ্চের পেছন দিকে। নদীর ঠিক মাঝখান দিয়ে যাচ্ছে লঞ্চটি। ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না বাবা কিনা? লঞ্চের পিছন দিকটা যখন চোখের সামনে আসল তখন দেখতে পেলাম বাবার সেই শীত চাদরটি হাত দিয়ে উপরের দিকে নাড়াচ্ছেন। মা তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর বাবা আসছে। মুহুর্তেই লঞ্চটি চোখের সীমা অতিক্রম করে গেল। আনন্দে তখন আমাদের চোখের পানি বাধ সাধল না। মনে হচ্ছে প্রভাতের এই সকালটি ঈদের খুশির মতো।
আজ অনেক ভালো লাগছে। বাবা ফিরছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শেষ। প্রিয় মানুষগুলোর জন্য এমনই মন কাঁদে। সাত দিনের দীর্ঘ অপেক্ষা। চোখ-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ এবার শেষ হলো। মা তরিঘরি করে রান্না বসালেন। বাবা এসে খাবেন। সাথে খেজুর গুর আর নারকেল দিয়ে চিতই পিঠা। বাবার সেই ঘিয়া রং এর চারটা আজও আমি খুজে বেড়াই। ওরকম একটি চাদর পেলে আমি কিনবো। ঐ রং এর চাদরটা আজও খুজে পেলাম না। যত টাকাই হোক কিনে আনবো। কিন্তু কোথাও পেলাম না সেই ঘিয়া রং এর কালো কাজ করা চাদর।

লেখক: মোঃ রিসালাত মীরবহর
সম্পাদক, অবেলার ডাক
বরিশাল, বাংলাদেশ।
Join Us:
অবেলার শপ: [Click]
আরও পড়ুন: ছোটঘর [Click]
টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হতে: অবেলার ডাক [Click]
হোয়াটস্ এ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হতে: অবেলার ডাক [Click]
আরও পড়ুন: অবেলার ডাক সম্পাদক পরিচিতি [Click]
প্রতিদিন কবিতা লিখতে: অবেলার ডাক সাহিত্য পরিষদ [Click]
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে: ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন [Click]
আসুন সুস্থ ধারার সাহিত্য চর্চায় সবাই সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেই [Click]
[লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করে সবাইকে পড়ার সুযোগ করে দিবেন। আজ এ পর্যন্তই, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। সুখময় হোক আপনার আগামী অনাগত দিনগুলো। আমাদের সাথে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ]
[আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠান। ধর্মীয় চর্চা অব্যাহত রাখুন। সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। সৎ ও সাধারণ জীবন যাপন করুন। অনলাইন জুয়া ও মাদকমুক্ত থাকুন। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন। দূর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ুন]
Writer & Editor: Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)


