অবেলার ডাক।। মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন-
كُلُّ نَفْسٍ ذَآىِٕقَةُ الْمَوْتِ ؕ
প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। যে কোন প্রাণীই হোক তার উপর মৃত্যু একবার আসবেই। ভালো হোক খারাপ হোক তাকে মরতে হবে। ইসলাম এমন একটি ধর্ম যেখানে যুগে যুগে মনবতার কল্যাণে অসংখ্য নবী-রাসূল ইসলামের আলোকে ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা দুনিয়াতে। পথভ্রষ্ট মানুষ খুজে পেয়েছে সঠিক পথের সন্ধান।
রোযার আরবি শব্দ সওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়- প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
(তরজমা) হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।-সূরা বাকারা (২): ১৮৩
তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী ও জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী ও ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী ও ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।
এছাড়া যাকাত ইসলামের অন্যতম একটি স্তম্ভ। নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলে এবং এক বছর অতিক্রম করলে সম্পদশালীর ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ। আল্লাহতায়ালা কোরআন কারিমে যাকাতের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বহু জায়গায় ইরশাদ করেছেন– ‘আর তোমরা নামাজ কায়েম করো, যাকাত আদায় করো এবং রুকু কর রুকুকারীদের সঙ্গে।’ (সূরা বাকারা : ৪৩)।
হাদিসে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, ‘হে মুয়াজ! তুমি জানিয়ে দাও– আল্লাহ তাদের সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনী ব্যক্তিদের থেকে নিয়ে দরিদ্র ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করা হবে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। রমজানে যে কোনো আমল করলে তার সওয়াব ৭০ গুণ বেড়ে যায়। তাই রমজান মাসে যাকাত আদায়ের ব্যাপারে প্রায় সবাই তৎপর থাকেন।
এছাড়া ফিতরাকে ইসলামী শরিয়তে ‘জাকাতুল ফিতর’ এবং ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ফিতরের জাকাত বা ফিতরের সাদকা। ফিতর বা ফাতুর বলা হয় সেই আহারকে, যা দ্বারা রোজাদার রোজা ভঙ্গ করে। হাদিসে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) জাকাতুল ফিতর হিসেবে মুসলমানদের ছোট-বড়, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-দাস প্রত্যেকের ওপর এক ছা খেজুর অথবা এক ছা যব ফরজ করেছেন এবং তিনি ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে লোকদের বের হওয়ার আগেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্য হাদিসে বর্ণিত, হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘আমরা এক ছা খাদ্য অথবা এক ছা যব অথবা এক ছা খেজুর অথবা এক ছা পনির অথবা এক ছা কিশমিশ থেকে জাকাতুল ফিতর বের করতাম। রাসুলে পাক (সা.)-এর যুগে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাবাজারে চালু থাকা সত্ত্বেও তিনি খাদ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন, আদায় করতে বলেছেন এবং বিভিন্ন শস্যের কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং, খাদ্যশস্য দ্বারা ফিতরা আদায় করাই ইসলামী শরিয়তের বিধান। ব্যক্তি নিজে যা খায়, তা থেকেই ফিতরা আদায়ের মধ্যে অধিক মহব্বত নিহিত। যে ব্যক্তি ৫০ টাকা কেজি দরের চাল খায়, সে উক্ত মানের চাল এক ছা ফিতরা দেবে। আর যে ব্যক্তি ৬০ টাকা বা ৭০ টাকা কেজি দরের চাল খায়, সে ওই মানের চাল এক ছা ফিতরা দেবে।
হাদিসে বর্ণিত, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলে পাক (সা.) সালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। রমজান শেষে শাওয়ালের চাঁদ ওঠার পর থেকে ঈদের মাঠে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফিতরা আদায়ের অতি উত্তম সময়।
ইসলাম এমন এক শান্তির ধর্ম যেখানে ধনীরা কেবল ভালো থাকবে আর দরিদ্ররা না খেয়ে খাকবে তা মানা হয়নি। এই বৈষম্য দূর করতে ইসলামে যাকাত ও ফিতরার বিষয়টি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পালন করার জন্য বলা হয়েছে এবং তা অত্যন্ত কঠিন ভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। যুগে যুগে ইসলাম মানুষের মাঝে শান্তি ও শৃঙ্খলার বার্তা নিয়ে এসেছে। তাই আমরা যেন পবিত্র রমজান মাসের উছিলায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় সকল অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, পাপাচার থেকে সারা বছর মুক্ত থাকতে পারি। রমজানুল কারীমের মহিমায় যেন মানুষের প্রতি দয়ালু হই, মানুষের উপকারে আসি, দ্বীনের খেদমত করি, কাউকে অন্যায় ভাবে কষ্ট না দেই, মিথ্যা সাথে নিজেকে জড়িয়ে সত্যকে আড়াল না করি, সুদ-ঘুষের মতো জঘন্য বিষয়কে যেন ত্যাগ করে চলতে পারি।
মহান আল্লাহর দেওয়া বিধানগুলোকে যেন সারা বছর আমরা মেনে চলি। তবেই একজন সত্যিকারের মুুমিন হিসেবে আমরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্ঠি অর্জন করতে পারবো। আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহ মহান এবং তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। তার হুকুম ছাড়া এই মহা বিশ্বের একটি পাতাও নড়ে না। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তাই আমরা যেন তারই ইবাদ করি। সময় মতো যেন নামাজ কায়েম করতে পারি। (আমীন)


