মোঃ রিসালাত মীরবহর।। আমরা মানুষ। তাই আমাদের আবেগ আছে অনুভূতি আছে। আছে আনন্দ কিংবা সুখ-দুঃখ। আছে রাগ কিংবা হাজারো অভিমান। আমরা যখন কাউকে ভালোবাসতে শুরু করি তখন উজার করে ভালোবাসতে পছন্দ করি। এমনকি নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আপন মানুষটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু জীবনে সেই ভালোবাসায় হঠাৎ করেই বেজে ওঠে বেদনা ভরা সুর। জীবনের সব রঙ্গীন স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খা আর ভালোলাগা তখন নিজের কাছে বিষময় মনে হয়।
মনে হয় জীবনটা বুঝি নরকের কোন এক খাদে গিয়ে আটকে গেছে। ভালোবাসার মানুষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন জীবনকে যেন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দাড় করিয়ে দেয়। দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার পরিবর্তে নেমে আসে কালো মেঘের ঘনঘটা। এমন পরিস্থিতিতে একে অপরকে দোষী স্বাবস্ত করেই আমরা অনেকে ক্ষান্ত হই না বরং প্রতিশোধ পরায়নও হয়ে উঠি। আর তাই বিকল্প ভালোবাসা খুজতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ি পরকিয়ার মতো একটি জঘন্য সম্পর্কে।
প্রত্যেক মানুষ প্রত্যাশা করে আপন মানুষের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার। কিন্তু সংসার জীবনে নানা জটিলতা আর সমীকরনে সেটা যেন অবাস্তব একটি বিষয়ে পরিণত হয়। সেই সাথে স্বামী-স্ত্রী জড়িয়ে পড়ছে একে অপরের মধ্যে ছোট থেকে মাঝারি কিংবা বড় আকারের মনোমালিন্যতায়। যা সংসার জীবনকে বিষাক্ত করে তুলছে। মূলত এখান থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ পরকীয়ার মতো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। পালিয়ে বেড়ায় নিজ সংসার কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক থেকে। তবে এটা ঠিক, সংসার নামক এই অধ্যায়টি মানুষের জীবনের একটি দীর্ঘ সময়কে অতিবাহিত করে চলতে হয়। তাই একই ছাদের নিচে বাস করতে গিয়ে দু’জনার মতের অমিল হতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন কোন দম্পত্তির মধ্যে ঝগড়া চরমে পৌছায় তখন তা রূপ নেয় পরকীয়ায় না হয় বিচ্ছেদে।
বিচ্ছেদ কিংবা পরকীয়া কোনটিই আমাদের জীবনের জন্য শুভ নয়। তবুও অনেকেই এ দুটি বিষয়ের মধ্যে আটকে যায়। আর এমন ভাবে আটকে যায় যেন চোরাবালিতে ঝাপ দেয়ার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছে নিজেদের কে। কারণ পারিবারিক জীবনে হারলে চলবে না। স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই জিততে হবে সংসার নামক জীবনে। একে অপরকে ভালোবাসার পরিবর্তে আমরা কখনো কখনো ছড়িয়ে দিচ্ছি বিষাক্ত কথার দাবানল। যা পুরে ফেলছে ভিতরে থাকা সুন্দর সুন্দর অনুভূতিগুলোকে। যা একসময় সঙ্গীর প্রতি এক ধরনের অনিহা তৈরি করছে। আর এতেই আমরা আমাদের জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ফেলি।
জীবনের এতো কাছে থেকেও আপন মানুষটাকে ছুড়ে ফেলে দিতে একটুও দ্বিধা করিনা অনেকেই। বরং নতুন করে আরেকজনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছি তার জীবনটাও। কিংবা ডিভোর্স দিয়ে নতুন করে ঘর সাজাচ্ছি অন্য কারও সাথে। কখনো কখনো এতে করে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো বাবা-মায়ের এমন বৈরিতার বলি হচ্ছে। ছন্দপতন ঘটছে তাদের কোমলমতী জীবনে। হয়তো কেউ কেউ হারাচ্ছে তাদের বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গ। এমন পরিস্থিতিতে ব্যহত হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক জীবন।
একে অপরের মধ্যে বিবাদের জেরে কাউকেই ছাড় দেওয়ার মতো উদারতা আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। উপরন্তু যুদ্ধের মতো সবকিছু পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেলেও আমরা যেন উভয়ে উভয়ের জায়গায় সঠিক। ভালোবাসা কিংবা একে অপরকে ভালো রাখার পরিবর্তে তখন আমরা হয়ে উঠি অনেক বেশি কঠিন। আর যাই হোক ছাড় দিতে নারাজ একে অপরকে। বিবাদ টা যখন চরমে তখন তৃতীয় কোন পক্ষ এসে ডিভোর্সের কাজটা যেন তরিঘরি হয় তার বন্দোবস্ত করতে একেবারেই মরিয়া।
মনে হয় তারা কোন দামী উপহার পাওয়ার আশায় এমন কাজটি সম্পন্ন করতে অনেকটাই অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তখনো কোন মায়া জন্মায় না। জন্মায় না ভালোবাসা। একসময়ে কাছাকাছি থাকা ভালোবাসার মানুষ দু’টো যেন জীবনের চরম সিদ্ধান্তে কেউ কাউকে পাশে নিচ্ছে না। জয়ী হতে হবে যে বিচ্ছেদের এ খেলায়। হারলে জীবনটাই যেন হেরে যাবে এমন একটি মনোভাব উভয়ে পোষন করে থাকে। তাই সঙ্গীর সামান্যতম ভুলগুলোকেও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার যেন কোন সুযোগ খুজে পায় না একে অপরে। কিংবা ভাবনায় থাকে না একমসয়ে একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কিংবা গভীর সেই অতীতের ভালোবাসার।
পরকীয়া কিংবা ডির্ভোস যাই হোক না কেন পারিবারিক, সামাজিক কিংবা মানসিক কোনদিক থেকেই হয়তো আপনাকে সুখে রাখবেনা। বরং যদি আপনি এ বিষয়গুলোর সাথে জড়িয়ে পড়েন তবে আপনি আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজটি সম্পাদন করলেন। যে আগুনে আপনি একা পুড়ছেন না বরং সবাইকে নিয়ে পুড়ছেন। আর এই আগুন আপনার সমস্ত জীবনটাকে এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে ১ জন করে তালাক প্রাপ্ত হচ্ছেন। যা আমাদের ছোট ছোট পরিবারগুলোকে ভেঙ্গে দিচ্ছে। পারিবারিক বন্ধনগুলো যেন খুব সহজেই হারিয়ে যাচ্ছে। তবে ডিভোর্স সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে পরকীয়া ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন: দারিদ্রতা, বেকারত্ব, মাদকাসক্ত, পারিবারিক অশান্তি, প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় অনুভূতি না থাকার কারণে ডিভোর্সের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সবসময় মনে রাখা উচিত ঘৃণায় ঘৃণা বাড়ে। আর ভালোবাসায় বাড়ে ভালোবাসা। সবচেয়ে উত্তম হয় দাম্পত্য কলহ এড়িয়ে চলার। ত্যাগ করতে শিখতে হবে। একই সাথে বিশ্বাস ও ভালোবাসার জায়গাটা অটুট রাখতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে একজনের প্রতি অন্যজনের ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। একটি বিষাক্ত কথার পরিবর্তে একটি ভালোবাসার কথা দিয়ে সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে।
জয়ী নয় বরং পরাজয় বরণ করতে হবে। কারন এই পরাজয় একদিন আপনাকে জয়ী করে তুলবে। মনে রাখবেন একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণীত হই এমন কাজ করা থেকে সবসময় বিরত থাকতে হবে। এছাড়া সম্পর্কের অবনতি হয় এমন কোন কাজ বা কথা থেকে যতটা পারা যায় নিজেকে বিরত রাখতে হবে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গাটা তৈরি করতে হবে। পরকীয়া একটি জঘন্যতম অপরাধ। এ বিষয়ে যার যা ধর্মীয় অনুভূতি রয়েছে সেগুলো মেনে চলতে হবে।
আমরা নিশ্চয়ই কেউ চাইব না একটি শিশুর জীবন ধ্বংস হয়ে যাক, শেষ হয়ে যাক একটি সুন্দর সংসার। আর তাই সবাইকে একটি পরিবার টিকিয়ে রাখতে সর্বদা চেষ্টা করে যেতে হবে। এ চেষ্টায় আমরা যেন পিছিয়ে না পড়ি। সুন্দর একটি সংসার যেন আমাদের সামান্য ভুলের কারণে শেষ হয়ে না যায়। একটি শিশুও যেন বঞ্চিত না হয় তার বাবা-মায়ের আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা থেকে। ভালোবাসায় ভরা থাকুক সবার জীবন। আর গড়ে উঠুক সুখী সমৃদ্ধ একটি সুন্দর জীবন সংসার।
Writer & Editor: Obalardak
E-mail: obalardak@gmail.com,
Barishal Sadar, Barishal, Bangladesh
Mobile: +8801516332727 (What's App)
Copyright Ⓒ 2025 । All Right Reserved By Obalardak [Click More]


